ওষুধ তৈরির গবেষণার প্রয়োজনে স্পেনের একটি গবেষণা কেন্দ্রে এক ঝাঁক মশা আটকে রেখেছিলেন বিজ্ঞানীরা। কিছুদিন পর বিজ্ঞানীরা আর্শ্চযের সঙ্গে লক্ষ্য করেন, আটকে রাখা মশাগুলোর শরীরে আর ম্যালেরিয়ার জীবাণু তৈরি হচ্ছে না। আর এতেই ম্যালেরিয়া নির্মূলে নতুন আশার আলাে দেখতে পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। খবর বিবিসির।

গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মানুষের শরীরে মশা থেকে ম্যালেরিয়া জীবাণুর সংক্রমণ বন্ধে ব্যাকটেরিয়ার একটি প্রাকৃতিক স্ট্রেন বা ধরন খুঁজে পান। হঠাৎ করেই ব্যাকটেরিয়ার এই স্ট্রেইনটি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন। গবেষণায় দেখা যায়, মশার ওপর ব্যাকটেরিয়ার ওই স্ট্রেন বা ধরন প্রয়োগের পর ম্যালেরিয়া জীবাণু আর বৃদ্ধি পায়নি।

বিশ্বে প্রাচীনতম রোগগুলির একটি ম্যালেরিয়া। প্রতি বছর সারাবিশ্বে প্রায় ৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এই রোগে। এর মধ্য অধিকাংশ আবার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। যদিও এর টিকা এখন বাজারে এসেছে, কিন্তু ম্যালেরিয়া-উপদ্রুত আফ্রিকায় গণহারে এর প্রয়োগ এখনও একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। গবেষকদের দাবি, নতুন যে ব্যাকটেরিয়ার কথা বলা হচ্ছে তা মালেরিয়া নির্মূলের পথে নতুন হাতিয়ায় হতে পারে।

জিএসকে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি পরিচালিত স্পেনের একটি গবেষণা কেন্দ্রে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে, ওষুধ তৈরির গবেষণার প্রয়োজনে আটকে রাখা এক ঝাঁক মশার শরীরে ম্যালেরিয়ার জীবাণু তৈরি হচ্ছে না। এ গবেষণায় নেতৃত্ব দেয়া ড. জ্যানেথ রড্রিগস বলেন, আমরা দেখলাম মশার ওই ঝাঁকের মধ্যে ম্যালেরিয়া জীবাণুর সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে এবং বছরের শেষ নাগাদ দেখা গেল তাদের মধ্যে ম্যালেরিয়া জীবাণুর সংক্রমণ একদম শূন্যে পৌঁছে গেছে।

বিজ্ঞানীদের দলটি ২০১৪ সালের তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্যাম্পল বা নমুনা ডিপ-ফ্রিজে সংরক্ষণ করে রাখেন। এর দু’বছর পর সেই নমুনায় কি ঘটলো তা খুঁটিয়ে দেখেন। গবেষণায় আরও দেখা যায়, টিসি-ওয়ান নামে ব্যাকটেরিয়ার ওই স্ট্রেন বা ধরন মশার অন্ত্রে মালেরিয়া জীবাণু তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

ডা. রড্রিগস আরও বলেন, এই টিসি-ওয়ান ব্যাকটেরিয়া কোনো মশার শরীরে ঢুকলে মশার জীবনচক্রের পুরোটা সময় ধরেই সক্রিয় থাকছে। আমরা প্রমাণ পেয়েছি যে এই ব্যাকটেরিয়াই মশাগুলোর দেহে সংক্রমণ কমানোর পেছনে কাজ করেছে।

বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন আবিষ্কৃত এই ব্যাকটেরিয়াটি মশার দেহে ম্যালেরিয়া জীবাণুর পরিমাণ ৭৩ শতাংশ কমিয়ে দিতে সক্ষম। এই ব্যাকটেরিয়াটি হারমেন নামে মলিকিউল বা ক্ষুদ্র একটি অণু নিঃসৃত করে যেটি মশার অন্ত্র-নালিতে প্রাথমিক পর্যায়ে ম্যালেরিয়ার জীবাণু তৈরির প্রক্রিয়া আটকে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জিএসকের বিজ্ঞানী দল যৌথ গবেষণায় দেখতে পান, ব্যাকটেরিয়ার নিঃসৃত হারমেন চিনি মিশিয়ে মুখের সাহায্যে অথবা ত্বকের ভেতর দিয়ে মশার শরীরে ঢোকানো যায়। মশা যেখানে বসে সেখানে এই হারমেন ছড়িয়ে রেখে এটি নিশ্চিত করা যায়।

গবেষণাগারের বাইরে বাস্তব জগতে হারমেন প্রয়োগ কতটা নিরাপদে এবং ম্যালেরিয়া দমন এটি কতটা কার্যকর তা নিয়ে এখন আফ্রিকার বুর্কিনা ফাসোতে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আশা করা হচ্ছে বিজ্ঞানীরা ব্যাকটেরিয়া-ভিত্তিক নতুন একটি ওষুধ তৈরি করে খুব দ্রুত হয়তো বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং প্রাণঘাতী এই রোগের মোকাবেলায় সক্ষম হবেন।

নতুন এই আবিষ্কারের ব্যাপারে ম্যালেরিয়া নির্মূলে ‘ম্যালেরিয়া নো মোর’ নামে একটি দাতব্য সংস্থার কর্মকর্তা গ্যারেথ জেনকিন্স বলেন, নতুন এই আবিষ্কার সত্যিই আশাব্যঞ্জক। প্রতি মিনিটে একটি শিশু ম্যালেরিয়ায় মারা যাচ্ছে। ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কমাতে হালে বেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু এই সাফল্য এগিয়ে নিতে আমাদের হাতে সৃজনশীল নতুন নতুন অস্ত্র প্রয়োজন। নতুন নতুন আবিষ্কার এবং সৃজনশীল গবেষণা অব্যাহত রাখা গেলে আমাদের জীবদ্দশাতেই ম্যালেরিয়া নির্মূল করা সম্ভব।

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *