মরণঘাতী রোগ ক্যানসার। বলা হয়ে থাকে এ ব্যাধির পরিণতি নিশ্চিত মৃত্যু। তবে সব ক্যানসারের ধরন একরকম না। কিছু ক্যানসার যেমন মারাত্মক, আবার কিছু আছে যেগুলো তুলনামূলক কম ভয়ানক। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এগুলো নিরাময়ও হতে পারে।

চলুন জানি, ক্যানসার কি? শরীরের কোনো অংশে কোষ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া-ই হলো ক্যানসার। সাধারণত প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্ত করা গেলে এবং সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করলে রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসার কতটা দ্রুত ছড়াবে সেটি সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। এটি কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে তা কোন স্টেজে ধরা পড়ছে তার পাশাপাশি এর লক্ষণ কতটা ধরা পড়ে এর ওপরেও নির্ভর করে।

ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা এনএইচএস, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট এবং চিকিৎসকের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসুন জানি কোন ধরনের ক্যানসার কতটা ভয়ানক বা তুলনামূলক কম ভয়ানক।

তুলনামূলক সহজ ক্যানসার
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো ক্যানসার শনাক্ত করতে বেশি দেরি হয়ে গেলে সেটা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। কিছু ক্যানসার খুব বেশি দ্রুত বিস্তার হতে থাকলেও আগে শনাক্ত সম্ভব হলে চিকিৎসা সহজতর হয়, আর কিছু ধীরগতিতে ছড়ালেও শনাক্ত হতে বেশি দেরি হয়ে গেলে চিকিৎসা কঠিন হয়।

বিশ্বে ২০০ এর বেশি ধরনের ক্যান্সার রয়েছে যার চিকিৎসা ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন ব্রেন বা ব্লাড ক্যানসারের বেশ কিছু ধরন থাকে যেগুলো চিকিৎসায় অনেকটাই ভালোভাবে সারানো যায়।

ব্রেস্ট ক্যানসার
বিশ্বব্যাপী যে ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সেটি স্তন ক্যানসার। এর চিকিৎসায়ও যথেষ্ট অগ্রগতিও হয়েছে। আমেরিকার ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী ব্রেস্ট ক্যানসার তিন গ্রেড বা ধরনের হয়ে থাকে যার মধ্যে গ্রেড ওয়ান বা লো গ্রেড সাধারণত ধীরগতিতে বাড়ে। ক্যানসার কোষ কী হারে, কীভাবে এবং কতটা দ্রুততার সাথে বাড়ে তার উপর এ গ্রেডগুলো নির্ভর করে। এটি ক্যানসারের চারটি স্টেজ বা পর্যায়ের অংশ নয়।

এর লক্ষণগুলো মধ্যে স্তনে শক্ত অংশ, নিপল থেকে তরল বের হওয়া এবং স্তনে পরিবর্তন দেখা যায়। সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সের নারীদের স্তন ক্যানসার বেশি হয়। স্তনের চামড়া, গড়ন বা ভেতরের দিকে যেকোনো অস্বাভাবিক অবস্থা মনে হলেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। সাধারণত এই ধরনের ক্যানসার অন্য ধরনের চেয়ে বেশি দেখা গেলেও স্তন ক্যানসারে মৃত্যুর হার বেশ কম থাকে। তবে বেশি দেরি করে চতুর্থ পর্যায়ে চলে গেলে চিকিৎসাটাও তুলনামূলক জটিল হয়।

প্রোস্টেট ক্যানসার
প্রোস্টেট ক্যানসার সাধারণত ধীরে বাড়ে, বিশেষ করে বৃদ্ধ পুরুষদের ক্ষেত্রে। এনএইচএসের তথ্য অনুযায়ী কোনো লক্ষণ বা চিকিৎসা ছাড়াই রোগী যুগ যুগ কাটিয়ে দিতে পারে। অনেক সময় এর তেমন চিকিৎসার প্রয়োজনও হয় না। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নির্মূলও সম্ভব। তবে অনেক সময় চিকিৎসকরা পরিস্থিতি বিবেচনায় চিকিৎসা নির্ধারণ করেন কারণ চিকিৎসায় ইরেক্টাইল ডিসফাংশন বা যৌন সক্ষমতায় প্রভাব এবং প্রস্রাব সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এজন্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসা বেছে নেয়া হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ কম থাকলেও প্রস্রাবের সমস্যাকে প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। যেমন বেশি টয়লেট যাওয়ার প্রবণতা, মূত্র নির্গমনে চাপ এবং মূত্রাশয় পুরোপুরি খালি না হওয়ার মতো অনুভূতি। এটি যেমন ধীরগতিতে বাড়ে তেমন প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা গেলে সুস্থ হওয়ার হার অনেক বেশি।

কোলন এবং রেকটাম

কোলন ক্যানসার বৃহদন্ত্রের ক্যানসার নামেও পরিচিত। আর রেকটাম হচ্ছে মলদ্বার। এই দুই ধরনের ক্যানসার সমস্যার হলেও এর চিকিৎসা তুলনামূলক বেশি প্রচলিত। কোলন ক্যানসার অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয় পলিপ থেকে যেটা কেটে ফেললেই সমস্যার অনেকটা সমাধান হয়ে যায়। কারণ পলিপটাই আস্তে আসে পাঁচ-সাত বছর, দশ বছর পার হয়ে ক্যানসার রূপান্তর হয়। সেক্ষেত্রে দুই তিন বছর পর পর কোলনস্কপি করানো ভালো।

এছাড়া এই ক্যানসার হয়ে গেলে বেশ কিছু লক্ষণ থাকে। যেমন মলের ধরনে পরিবর্তন, মলের সাথে রক্ত বা এমনিতে রক্ত, মলত্যাগ করার পরও অস্বস্তি, পেট ব্যথা, ওজন কমা, দুর্বলতা এমন অনেক বিষয় রয়েছে। এর কোনোটা তিন সপ্তাহ বা তার বেশি হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

পাকস্থলির ক্যানসার

চিকিৎসা করে পাকস্থলির ক্যানসারও প্রাথমিক পর্যায়ে সারানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সাফল্য পাওয়া গেছে। যদিও এর লক্ষণ ধরতে পারাটা অনেক সময় কঠিন হয়। এক্ষেত্রে এনএইচএস যে লক্ষণ উল্লেখ করছে এর মধ্যে রয়েছে বুক জ্বালাপোড়া বা অ্যাসিডিটি, খাবার গেলার সমস্যা, শরীর খারাপ লাগা, হজমে সমস্যা, খাবার অল্প খেয়ে পেট ভরে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা, পেটের উপরের দিকে ব্যথা বা দলার মতো বোধ হওয়া, হঠাৎ ওজন কমা এমন বিষয়। তিন সপ্তাহের বেশি লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের কাছে যেতে বলা হয়।

মারাত্মক ধরনের ক্যানসার
কিছু ক্যানসার বেশি প্রাণঘাতি হয় কারণ এর লক্ষণগুলো সেভাবে প্রকতভাবে সামনে আসে না, যখন আসে ততক্ষণে বেশ দেরি হয়ে যায়। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন ডিম্বাশয়ের ক্যানসার, ফুসফুস অথবা অগ্নাশয়ের ক্যানসারের রোগীরা সাধারণত তাদের কাছে আসেন বেশ দেরিতে কারণ লক্ষণগুলো বুঝে উঠতে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়।

অগ্নাশয়ের ক্যানসার
অগ্নাশয় বা প্যানক্রিয়াসের অবস্থান পাকস্থলির ঠিক নিচ দিকে থাকে। এটি খাবার হজম বা ইনসুলিনের মতো হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে। এর লক্ষণ হিসেবে বলা হয়, চোখ বা ত্বক হলুদ বর্ণ ধারণ, ত্বক চুলকানি ভাব, মলমূত্রের রঙ পরিবরতন, ক্ষুধামন্দা, দুর্বল বোধ করা, কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়া, জ্বর ওঠা, ডায়রিয়া অথবা কোষ্ঠ্যকাঠিন্য, হজমে সমস্যা, পেটের উপরের দিকে ব্যথা যেটা খাওয়ার সময় বা শুলে বেড়ে যায় ও সামনে ঝুঁকলে কম মনে হয়।

ফুসফুসের ক্যানসার

ন্যাশনাল ক্যানসার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী স্তন ও প্রস্টেট ক্যান্সারের পর সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ফুসফুসের ক্যান্সার। এটির বিস্তার দ্রুত হয় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ থাকে না। এর মাঝেও বেশ কিছু লক্ষণ থাকে। যেমন অবিরাম কাশি, কাশির সাথে রক্ত, ক্রমাগত শ্বাসকষ্ট, কারণ ছাড়া ক্লান্তি ও ওজন কমা, শ্বাস বা কাশির সময় ব্যথা বা ব্যথা ভাব।

ইসোফেগাস বা খাদ্যনালির ক্যানসার
খাদ্যনালী দিয়ে খাবার সাধারণত পাকস্থলি পর্যন্ত পৌঁছায়। খাদ্যনালী ক্যানসারে খুব বেশি লক্ষণ বুঝা যায় না, যেমন রোগী প্রথম লক্ষণ নিয়ে আসেন যে খাবার গিলতে কষ্ট হচ্ছে, এটা শুনলে বুঝা যায় এটি বেশ অ্যাডভানসড পর্যায়ে চলে গেছে। এর আগে তেমন ভালো লাগছে না, অথবা খাবার খেলে গ্যাস বা অ্যাসিডিটি হওয়া মতো বোধ হচ্ছে সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয় না।

ওভারিয়ান ডিম্বাশয়ের ক্যানসার
নারীর প্রজননের সাথে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ডিম্বাশয়। এটিকে নীরব ঘাতক হিসেবে দেখা হয় কারণ চিকিৎসকদের মতে, এই ক্যান্সারের প্রাথমিক উপসর্গ প্রায় লক্ষ্যই করা যায় না।া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যথা হয় না। তবে পরিবারে এই ধরনের ক্যানসারের প্রবণতা থেকে থাকলে এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এছাড়া যে লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয় তার একটি হলো- ক্ষুধামন্দা। এর বাইরে পেট ব্যথা, যোনিপথে রক্তক্ষরণ, মলমূত্র ত্যাগের অভ্যাসের পরিবর্তন, এমন কোনও লক্ষণ দুই সপ্তাহ বা এর বেশি হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বা সিডিসি।

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *