• November 7, 2026
  • ইমদাদুল হক জুয়েল
  • 0

অদ্ভুদ এক দেশ আমাদের বাংলাদেশ! আর দেশের জনগণ আরও অদ্ভুদ। বিশ্ব যেখানে মহাকাশ কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস নিয়ে গবেষণা করে। আমরা তখন পড়ে আছি কুসংস্কার আর অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে। বিজ্ঞানকে না জেনেই উয়ে ওঠার চেষ্টা করছি মহাবিজ্ঞানী। এই যেমন ধরুন কেউ একজন মোটর সাইকেলের ইঞ্জিন দিয়ে হেলিকপ্টার বানানোর বৃথা চেষ্টা করে মহাবিজ্ঞানী বনে যাচ্ছেন! আবার কেউ মধ্যাকর্ষণ শক্তি কি, তা না বুঝেই বিদ্যুৎ আবিষ্কাররের দাবি করে বসছেন। বিজ্ঞান না জেনে না বুঝে এসব আনাড়ি চেষ্টা হাসির খোরাক ছাড়া যেন কিছুই নয়!

বিজ্ঞান চলে তার নিজস্ব সূত্র বা নিয়ম মেনে। এখানে আছে গাণিতিক হিসাব–নিকাশ। বিজ্ঞানের একটি সূত্রের সঙ্গে অন্যটি অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। হুট করে সব নিয়ম বাদ রেখে কোনো সূত্র হয় না, কোনো থিওরি হয় না। প্রকৃতির নিয়ম বা বিজ্ঞান কোনো আলাদা বিষয় না। সব একসূত্রেই গাঁথা।

আমাদের দেশের কতিপয় মহাবিজ্ঞানীদের উদাহরণ দেয়া যাক। এই যেমন ধরুন, ২০২৪ সালে খুলনার এক কলেজছাত্র লোহার পাইপ ঝালাই করে মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন বসিয়ে হেলিকপ্টার বানালেন। রোটর ঘুরল, জনতা তালি দিল। পদার্থবিজ্ঞান অবশ্য তালি দেয়নি, কারণ সত্যিকারের হেলিকপ্টারে লাগে নির্ভুল বায়ুগতীয় নকশা, ওজনের ভারসাম্য, টর্কের হিসাব, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আর ধারাবাহিক পরীক্ষা। ওসব বাহুল্য, রোটর ঘুরলেই তো হলো!

দেশে ভূইফোঁড় গণমাধ্যমের কল্যাণে হইচই ফেলে দেয়া আরেক মহাবিজ্ঞানী কথাই ধরুন। কুমিল্লার এক মাদ্রাসাছাত্র জানালেন, মধ্যাকর্ষণ দিয়ে বিদ্যুৎ বানানো সম্ভব, আইডিয়াটা নাকি ধর্মীয় গবেষণা থেকে পাওয়া। শক্তির নিত্যতার সূত্র বেচারা জানে না যে সে এত বড় আবিষ্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শক্তি নিজে জন্মায় না, শুধু রূপ বদলায়। কিন্তু সে কথা কে শোনে!

বগুড়ার আরডিআইয়ের ফ্রি এনার্জি মডেলটি আরও চমৎকার। ইন্ডাকশন মোটর জেনারেটর ঘোরায়, জেনারেটরের বিদ্যুতে মোটর চলে, সঙ্গে একটা লোডও চলে। অর্থাৎ যন্ত্র নিজেই নিজেকে চালাচ্ছে। যেন নিজের চুল ধরে টেনে নিজেকে শূন্যে তোলা। অথচ এখানে তারা ফ্লাইহুইলের কথা বেমালুম ভুলে যান। ফ্লাইহুইল ব্যাংকের মতো: জমা রাখে, ফেরত দেয়, কিন্তু যা জমা পড়েনি তা দিতে পারে না। পুলি লাগিয়ে আরপিএম কমালে টর্ক বাড়ে, কিন্তু ক্ষমতা বাড়ে না। ঘর্ষণে কিছু শক্তি তাপ হয়ে উড়ে যায়, ফলে আউটপুট সবসময় ইনপুটের চেয়ে কম। এটা প্রকৃতির নিয়ম, কারও ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়।

তবু ফল না পেলে এই আবিষ্কারকদের অনেকে ভুল স্বীকার করেন না। বলেন, সরকার তহবিল দিলেই নাসা আর বুয়েটকে টেক্কা দিয়ে দেবেন। মোটর, জেনারেটর আর পুলিতে যে অসাধ্য সাধন করা যায়, এটা নাসা এতদিন বুঝতেই পারেনি, কী লজ্জা!

মানিকগঞ্জের এক যুবকের প্লেনে ওড়ার খবর টেনে কেউ কেউ বলবেন, ‘দেখো, ছেলেটি বিজ্ঞানীদের চেয়ে কম কিসে।’ অথচ ইউটিউবে সার্চ দিলে এরকম হেলিকপ্টারের ডজন ডজন ভিডিও মেলে। ইউরোপ-আমেরিকায় শখের মানুষ বুশ প্লেন, আল্ট্রালাইট প্লেন বানান, নিজেরাই বলেন ‘এটা আমাদের শখের পরীক্ষা।’ সেখানে এর নাম ডিআইওয়াই সম্প্রদায়, আর এখানে এর নাম ‘জাতীয় গৌরব।’

আলিবাবা থেকে পাঁচ হাজার টাকায় চীনা ইঞ্জিন এনে প্লেন বানানো সত্যিই প্রশংসনীয়। সমস্যা শুধু একটাই: প্রশংসায় থামতে না পেরে যখন আবিষ্কার বলে সরকারি তহবিলের আবেদন জমা পড়ে। এ ধরনের প্লেন বানানো গেলেও এর পেটেন্ট নেওয়া যায় না। মানে নিজের নামে একটা জিনিস আবিষ্কার করলেন, অথচ সেটা পেটেন্টের অযোগ্য। এমন বিরল প্রতিভা সত্যিই দুর্লভ।

আরও মজার ব্যাপার, শিক্ষিত, সচেতন মানুষও যাচাই না করে পোস্ট শেয়ার করেন। বিদেশে কনটেন্ট নির্মাতারা জেট ইঞ্জিনে সাইকেল চালান, থরের হাতুড়ি বানান, এই আমাদের আবিষ্কারকদের চেয়ে কয়েক গুণ বড় স্কেলে। হ্যাকস্মিথ বা কলিন ফুরজ কিন্তু একবারও বলেননি, ‘আমরা নতুন কিছু আবিষ্কার করেছি।’ তারা বলেন, ‘এটা এক্সপেরিমেন্ট।’ কী অদ্ভুত বিনয়!

আমাদের দিনাজপুরের সবুজ হোসেনও তেমনি। যন্ত্র বানান, কৃষকের কাজে লাগান, ভিডিও করে আয় করেন, কিন্তু নিজেকে বিজ্ঞানী বলেন না। তার যন্ত্র অন্য কেউ বানালে হয়তো ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘যুগান্তকারী আবিষ্কার’ বলে প্রচার হতো। তফাতটা যন্ত্রে নয়, মার্কেটিংয়ে।

গোলমালটা আসলে সংজ্ঞায়। পরীক্ষা মানে ধারণা যাচাই, শেখা, হাতে-কলমে বোঝা। মূল্যবান, কিন্তু আবিষ্কার নয়। আবিষ্কার মানে সত্যিই নতুন কিছু, যা আগে ওভাবে ছিল না। উদ্ভাবন মানে সেই নতুনকে কাজের, নির্ভরযোগ্য আর বড় পরিসরে ব্যবহারযোগ্য করা। ইউটিউব দেখে জানা নকশা জোড়া দিলে আবিষ্কারক হওয়া যায় না, রান্নার ভিডিও দেখে বিরিয়ানি রাঁধলে যেমন নতুন খাবার আবিষ্কার হয় না।

অথচ জুলহাসের প্লেনের ভিডিও দেখে অনেকের মনে হচ্ছে, বোয়িং আর এয়ারবাসের দিন বুঝি শেষ! ওই দুই কোম্পানি তো দশকের পর দশক গবেষণা, পরীক্ষা আর হাজারো পেটেন্ট নিয়ে বসে ছিল, বেকুব আর কী। তাদের অপেক্ষা করা উচিত ছিল ইউটিউব ভিডিওর। ‘মোবাইল সাংবাদিকেরা’ এমনভাবে লেখেন যেন মানবজাতির ইতিহাসে এই প্রথম কেউ প্লেন বানিয়ে আকাশে উড়ল। কিছু কোম্পানি আবার স্পনসরও করছে। হাততালির বাজারে বিজ্ঞাপন তো থাকবেই।

শেখার জন্য পরীক্ষা অপরিহার্য। এর গুরুত্ব অস্বীকার করছি না। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ছোট ক্লাস থেকেই হয়। ছোট হেলিকপ্টার, সৌরশক্তির গাড়ি, সহজ রোবট, সবই দক্ষতার প্রকাশ। আমাদের আরও বেশি পরীক্ষা দরকার। তবে উদ্দেশ্য হবে শেখা, জাতীয় পুরস্কার বা সরকারি অনুদান নয়। সমস্যা তখনই, যখন সাধারণ ডিআইওয়াই-কে যুগান্তকারী উদ্ভাবন বলে প্রচার করা হয়, আর সঙ্গে সরকারি অর্থের আশা জাগানো হয়।

যন্ত্রাংশ জুড়ে মডেল বানানো যায়, কিন্তু সেখান থেকে কীভাবে নতুন প্রযুক্তি দাঁড়ায়, তা বুঝতে লাগে পদার্থবিজ্ঞান আর গণিত। এ দুটোর সঙ্গে অনেকেরই সম্পর্ক ভালো নয়। পরীক্ষা আর আবিষ্কারের তফাৎ বোঝার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অধিকাংশ মোবাইল সাংবাদিকেরও নেই। ফলে প্রথম সারির গণমাধ্যমেও তা আবিষ্কার বলে ছাপানো হয়।

এই হইচইয়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে যারা সত্যিই কিছু করেছেন তাদের প্রচেষ্টা। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট লবণসহিষ্ণু ব্রি ধান ৪৭ আর জিংকসমৃদ্ধ ব্রি ধান ৬২ দিয়েছে। ‘বিনা’ দিয়েছে স্বল্পজীবনকালের ধান আর ‘বিনা সরিষা’, যার গড় ফলন হেক্টরে প্রায় দুই টন। ‘বারি’র বিটি বেগুনে ফলনের ক্ষতি ৯০.২৯ শতাংশ কম, বাজারযোগ্য ফলন ৭৫.৬৭ শতাংশ বেশি।

পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট উন্মোচন করেছে দেশি ও তোষা পাটের জিনোম সিকোয়েন্স। এসব কৃষকের ক্ষতি কমিয়েছে, লবণাক্ত জমিতে ফসল ফলিয়েছে, আমদানিনির্ভরতা কমিয়েছে। কিন্তু এতে ভিউ নেই, তাই শিরোনামও হয় না।

চিকিৎসায় ক্ষেত্রেও একই দশা। খাবার স্যালাইনের বিকাশে ডা. রফিকুল ইসলামের ভূমিকা, যিনি ১৯৭১ সালে শরণার্থী শিবিরে কলেরা রোগীদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। অধ্যাপক ডা. সাহেবা আক্তারের সাইবাস পদ্ধতি, যা প্রসবোত্তর রক্তপাত ঠেকিয়ে লাখ লাখ মায়ের জীবন বাঁচাচ্ছে। এগুলো মানুষের প্রাণ বাঁচায়, তবে ভাইরাল হয় না। আর মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনে হেলিকপ্টার? তা জাতীয় সাফল্য!

ফজলুর রহমান খান, ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই প্রকৌশলীকে বলা হয় ‘স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আইনস্টাইন।’ তার টিউবুলার স্ট্রাকচার কম ইস্পাতে আরও উঁচু ভবন বানানোর পথ খুলেছে। জন হ্যানকক সেন্টার, উইলিস টাওয়ার, বুর্জ খলিফায় তার ধারণার ছাপ, হজ টার্মিনালের নকশায়ও তার হাত। অথচ দেশের অনেকেই তার নাম শোনেননি।

ব্র্যাক অন্বেষা, দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়-নির্মিত ন্যানো স্যাটেলাইট, কয়টা মানুষ জানে? ২০২৬ সালে ইউআইইউয়ের মার্স রোভার টিম বিশ্বে তৃতীয় আর এশিয়ায় প্রথম হলো, তা নিয়ে কতটুকু আলোচনা হলো? ওসবে ক্লিক পড়ে না যে।

গণমাধ্যমের কনটেন্ট বাছাইয়ের মাপকাঠি পরিষ্কার—দেশের সক্ষমতা নয়, ভিউ। কেউ বুশ প্লেন বানালে বা মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনে হেলিকপ্টার জুড়লে সংবাদ হয়। এর নকশা যে ইউটিউবেই পাওয়া যায়, তা একবার খুঁজে দেখার সময় কারও হয় না। এটা গণমাধ্যমের ব্যর্থতারই প্রমাণ।

কেউ বলবেন, এসব উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ঠিক কথা। কিন্তু মেধার অভাব এ দেশে নেই, অভাব পরিবেশের। জিডিপির মাত্র ০.৩ শতাংশ আমরা গবেষণায় খরচ করি। ভিয়েতনাম করে প্রায় ০.৫৪, ভারত ০.৭০, চীন ২.৫৫।

গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সে ২০২৫ সালে আমরা ১০৬তম, ভারত ৩৮তম। ২০২৪ সালে আমাদের দেশে পেটেন্ট আবেদন জমা পড়েছে মাত্র ১১৬টি, ২০২৩ সালে ছিল ৮৬টি। আর ২০২৩ সালে ভারতে প্রায় ৬৪ হাজার ৪৮০টি, জার্মানিতে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার, দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার, জাপানে ৪ লাখ ১৪ হাজার, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫ লাখ ১৮ হাজার, চীনে প্রায় ১৬ লাখ ৪০ হাজার। আমরা তাহলে একই দৌড়ে আছি, তবে বাকিরা মহাসড়কে, আর আমরা ভিডিওর কমেন্ট সেকশনে।

প্রতিভার অভাব আমাদের নেই। অভাব গবেষণা-সুবিধা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, যথাযথ স্বীকৃতি আর দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গির। উদ্ভাবনের সাফল্য কতটা ভাইরাল হলো, তা দিয়ে নয়, মানুষের বাস্তব সমস্যা কতটা মিটল, তা দিয়েই বিচার হওয়া উচিত। কারণ একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি ভাইরাল হওয়ার ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে গবেষণা, প্রকৌশল আর উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানুষের জীবনে কতটা স্থায়ী পরিবর্তন আসছে তার ওপর। আর সেই পরিবর্তন আনতে লাগে ল্যাবরেটরি, লাগে অর্থ, লাগে ধৈর্য। রোটর ঘুরলেই যদি আবিষ্কার হতো, তাহলে আমাদের দেশের সব ফ্যানই নোবেল পুরস্কার পেত!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *