
আপনি যে বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন, যে পানি পান করছেন, যে খাবার প্লেটে তুলছেন—এর প্রতিটির পেছনে কাজ করছে একটি অদৃশ্য, বিশাল ও জটিল জাল। এই জালের নাম জীববৈচিত্র্য। অথচ আমরা যতটা না একে মূল্য দিই, তার চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে আমরাই একে ধ্বংস করে চলেছি। প্রশ্ন হলো—এই ক্ষতির মূল্য শেষ পর্যন্ত কে চোকাবে?
জীববৈচিত্র্য বলতে আসলে কী বোঝায়
সহজ ভাষায় বললে, জীববৈচিত্র্য হলো পৃথিবীতে টিকে থাকা জীবনের সামগ্রিক বৈচিত্র্য—উদ্ভিদ, প্রাণী, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত সবকিছু। কিন্তু ধারণাটি নিছক প্রজাতির তালিকা তৈরির চেয়ে অনেক গভীর। এটি একই সঙ্গে তিনটি স্তরে কাজ করে—একক প্রজাতির ভেতরের জিনগত বৈচিত্র্য, বিভিন্ন প্রজাতির নিজেদের মধ্যকার বৈচিত্র্য এবং বন বা প্রবাল প্রাচীরের মতো গোটা বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য। এই তিন স্তরই একসঙ্গে কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রেখেছে।
বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন যে পৃথিবীতে ঠিক কত প্রজাতি আছে। নথিভুক্ত হয়েছে প্রায় ১৭ লাখ প্রজাতি, তবে প্রকৃত সংখ্যা কয়েক কোটি পর্যন্ত হতে পারে বলে অনুমান করা হয়—অনেক গবেষণায় ৮০ থেকে ৮৭ লাখের মতো পরিসংখ্যানও উঠে আসে। মজার বিষয় হলো, পরিচিত প্রজাতির শতকরা ৯৫ ভাগের বেশিই মেরুদণ্ডহীন প্রাণী—পোকামাকড়, মাকড়সা, কেঁচোর মতো ক্ষুদ্র প্রাণী, যাদের আমরা সচরাচর গুরুত্বই দিই না। অথচ মাত্র এক চিমটি সুস্থ মাটিতে হাজার হাজার প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া বাস করে, আর সেই মাটিই শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় সব খাদ্যের উৎস।
কেন এটি নিছক প্রকৃতি-প্রেমের বিষয় নয়
শহরে বসবাসকারী অনেকের কাছে বন্যপ্রাণী মানে টিভির পর্দায় দেখা কোনো তথ্যচিত্র। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জীববৈচিত্র্য আমাদের অস্তিত্বের একেবারে মূলে জড়িয়ে আছে।
খাদ্য ও স্বাস্থ্যের ভিত্তি: পরাগায়নকারী পোকামাকড় না থাকলে অধিকাংশ ফল ও বাদাম উৎপাদন সম্ভব নয়। আবার প্রকৃতি আধুনিক চিকিৎসারও এক বিশাল উৎস—বিশ্বজুড়ে প্রায় চারশ কোটি মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল, আর ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের একটি বড় অংশ প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত বা সরাসরি প্রকৃতি থেকেই পাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় প্রেসক্রিপশন ওষুধগুলোর সিংহভাগই প্রাকৃতিক উৎসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা: উপকূলে প্রবাল প্রাচীর ও ম্যানগ্রোভ বন ঘূর্ণিঝড় ও সুনামির আঘাত অনেকটাই প্রশমিত করে। বন ও জলাভূমি ভূমিধস ও বন্যা ঠেকাতে সাহায্য করে, শহরের গাছপালা বায়ুদূষণ শোষণ করে।
অর্থনীতির চাকা: বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক উৎপাদনের একটি বিশাল অংশ—অনুমান অনুযায়ী বৈশ্বিক জিডিপির অর্ধেকেরও বেশি—প্রকৃতি ও তার সেবার ওপর মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রায় নির্ভরশীল। নির্মাণ, কৃষি এবং খাদ্য-পানীয় শিল্প এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, কারণ এগুলো সরাসরি প্রকৃতির সম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আবার চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী মানুষদের একটি বড় অংশ সরাসরি বন্যপ্রাণী ও বনজ সম্পদের ওপর জীবিকা নির্বাহ করে।
রোগ প্রতিরোধ: এটি হয়তো সবচেয়ে কম আলোচিত দিক—সুস্থ ও অক্ষত বাস্তুতন্ত্র প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমিত হওয়া রোগের প্রকোপ কমাতে সাহায্য করে। মানুষের সংক্রামক রোগের একটি বড় অংশের উৎসই প্রাণিজগৎ, আর অপরিকল্পিত নগরায়ণ মানুষ ও বন্যপ্রাণীকে যত কাছাকাছি নিয়ে আসছে, নতুন মহামারির ঝুঁকিও ততই বাড়ছে।
জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ: বন ও মহাসাগর প্রাকৃতিক কার্বন শোষক হিসেবে কাজ করে, নিঃসৃত গ্রিনহাউস গ্যাসের একটি বড় অংশ শুষে নিয়ে বিশ্বকে দ্রুত উষ্ণ হওয়া থেকে রক্ষা করে। জলবায়ু লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় নির্গমন হ্রাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসতে পারে শুধু প্রকৃতির সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার থেকেই।
সংকটের গভীরতা কতটুকু
পরিসংখ্যানগুলো স্বস্তিদায়ক নয়। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭০ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী বন্যপ্রাণীর গড় জনসংখ্যা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। প্রজাতি বিলুপ্তির হার এখন প্রাকৃতিক হারের চেয়ে হাজার থেকে দশ হাজার গুণ বেশি বলে অনুমান করা হয়—যা ডাইনোসর বিলুপ্তির সময়কার হারকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ কারণেই অনেক বিজ্ঞানী মনে করছেন, পৃথিবী ইতিমধ্যে তার ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
গত শতাব্দীতে বাঘের সংখ্যা কমেছে প্রায় সম্পূর্ণভাবে। জার্মানিতে গত আড়াই দশকে উড়ন্ত পতঙ্গের সংখ্যা কমেছে তিন-চতুর্থাংশের বেশি। নদী ও হ্রদের মিষ্টি পানির প্রাণীদের অবস্থা আরও করুণ—পাঁচ দশকে তাদের সংখ্যা কমেছে প্রায় ৮০ শতাংশ। সমুদ্রেও চিত্র ভিন্ন নয়: বিশ্বের অধিকাংশ মৎস্যভাণ্ডার ইতিমধ্যে অতিরিক্ত আহরিত বা নিঃশেষের পথে, আর হাঙর-টুনার মতো বড় শিকারী মাছের সংখ্যা কমেছে নাটকীয়ভাবে।
একজন প্রথিতযশা প্রাণিবিজ্ঞানী একবার সতর্ক করেছিলেন যে মানবজাতি বর্তমানে নিজের অজান্তেই জীবনের বিশাল এক পাঠাগার পুড়িয়ে ফেলছে—এমন সব প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে যেগুলো সম্পর্কে বিজ্ঞান কিছু জানারও সুযোগ পায়নি।
কারণগুলো কোথায়
জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রধান কারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা। কৃষিজমি সম্প্রসারণ, গবাদি পশু চারণ ও নগরায়ণের জন্য প্রতিনিয়ত বন উজাড় হচ্ছে—শুধু একটি বছরে বিশ্বজুড়ে হারিয়ে যাওয়া বনের পরিমাণ ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের সম্মিলিত আয়তনের সমান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত মাছ ধরা, চোরাশিকার, শিল্প দূষণ, আক্রমণাত্মক প্রজাতির বিস্তার এবং সবার ওপরে জলবায়ু পরিবর্তন। বাসস্থান যখন খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়, তখন প্রাণীদের অবাধ চলাচল, খাদ্যসংস্থান ও প্রজনন কঠিন হয়ে পড়ে—আর তাতে ভেঙে পড়ে বাস্তুতন্ত্রের ভেতরের সূক্ষ্ম যোগাযোগব্যবস্থা।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই কারণগুলো পরস্পর সংযুক্ত ও পরস্পরকে ত্বরান্বিত করে। বন উজাড় জলবায়ু পরিবর্তনকে বাড়ায়, জলবায়ু পরিবর্তন আবার বাস্তুতন্ত্রকে দুর্বল করে, আর দুর্বল বাস্তুতন্ত্র মানুষের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করে।
জলবায়ু সংকট বনাম জীববৈচিত্র্য সংকট
দুটি সংকটকে অনেকেই আলাদা করে দেখেন, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এদের যমজ সংকট হিসেবে বর্ণনা করেন। পার্থক্য একটি জায়গায়—জলবায়ু পরিবর্তন তাত্ত্বিকভাবে বিপরীতমুখী করা সম্ভব, যদিও তাতে শতাব্দী পেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু একবার কোনো প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেলে তা চিরতরে হারিয়ে যায়—বিশেষ করে যেসব প্রজাতি সম্পর্কে বিজ্ঞান এখনো কিছু জানেই না। তাই জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিকে অনেকে জলবায়ু সংকটের চেয়েও বেশি অপরিবর্তনীয় ও তাই বেশি বিপজ্জনক হিসেবে দেখেন।
আশার জায়গাটুকু কোথায়
সমাধান পুরোপুরি অসম্ভব নয়। বিশ্বজুড়ে এখন ভূমির প্রায় ১৫ শতাংশ ও মহাসাগরের প্রায় ৭ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে সংরক্ষিত। জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য কনভেনশনের অধীনে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর ৩০ শতাংশ ভূমি ও সমুদ্র সংরক্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—যা পরিবেশবাদীদের কাছে ‘থার্টি বাই থার্টি’ নামে পরিচিত।
তবে শুধু সংরক্ষিত এলাকা তৈরি করলেই চলবে না। স্থানীয় মানুষের জীবিকাকে উপেক্ষা করে গড়ে তোলা অভয়ারণ্য দীর্ঘমেয়াদে টেকে না। বরং বন্যপ্রাণীকে মৃত অবস্থার চেয়ে জীবিত অবস্থায় বেশি মূল্যবান করে তোলা—যেমন প্রকৃতি-নির্ভর পর্যটনকে উৎসাহিত করা বা বন্যপ্রাণীর আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া—অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। একইভাবে বিচ্ছিন্ন সংরক্ষিত এলাকার বদলে বৃহৎ পরিসরে পরস্পর সংযুক্ত বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলাও জরুরি, যাতে প্রজাতিরা মুক্তভাবে চলাচল করতে পারে।
প্রাকৃতিক সম্পদের আর্থিক মূল্য নির্ধারণও একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। এক শহরের কর্তৃপক্ষ একবার প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণে যে অর্থ বিনিয়োগ করেছিল, তা পরবর্তীতে বিশাল অঙ্কের কৃত্রিম পানি শোধনাগার নির্মাণের খরচ থেকে তাদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল—প্রমাণ করে যে প্রকৃতি রক্ষা কেবল নৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও লাভজনক।
ব্যক্তি পর্যায়েও ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। গরুর মাংস ও পাম তেলের মতো যেসব পণ্যের উৎপাদনে বনভূমি সবচেয়ে বেশি ধ্বংস হয়, সেগুলোর ব্যবহার সচেতনভাবে কমানো, টেকসই বিকল্প বেছে নেওয়া এবং স্থানীয় সংরক্ষণ উদ্যোগে সমর্থন জোগানো—এসবই ছোট কিন্তু অর্থবহ পদক্ষেপ।
শেষ কথা
জীববৈচিত্র্য কোনো বিলাসী ধারণা নয়, বরং এটি আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। এটি একই সঙ্গে আমাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, জলবায়ু নিরাপত্তা এবং সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি প্রজাতি হারিয়ে গেলে তার ক্ষতি শুধু সেই প্রজাতির নয়—তা গোটা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যে ফাটল ধরায়, আর সেই ফাটলের প্রভাব শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে মানুষের জীবনেই।
সুখবর হলো, এই ক্ষতি এখনো পুরোপুরি অপরিবর্তনীয় নয়। সিদ্ধান্ত এখন আমাদের—আমরা কি প্রকৃতিকে কেবল সম্পদ হিসেবে দেখব, নাকি এমন এক সহযাত্রী হিসেবে দেখব, যার ওপর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকা নির্ভর করছে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ইউনাইটেড নেশন এনভায়রনমেন্টাল প্রোগ্রাম, ক্লায়েন্ট আর্থ, গ্রিন পিস



