সকালে ঘুম থেকে উঠে যে এক গ্লাস পানি আপনি নির্দ্বিধায় গলায় ঢেলে দেন, সেটি নিয়ে আপনি সম্ভবত এক সেকেন্ডও ভাবেন না। ভাবার কথাও নয়। আমরা ধরেই নিই—পানি নিরাপদ, বাতাস নির্মল, খাবার দূষণমুক্ত।

মিশিগানের ফ্লিন্ট শহরের মানুষও ঠিক তাই ভাবতেন। ২০১৪ সালে খরচ বাঁচানোর একটি হিসাবি সিদ্ধান্তে শহরের পানির উৎস বদলে দেওয়া হলো। ট্যাপ থেকে বেরোতে লাগল দুর্গন্ধযুক্ত বাদামি পানি, আর কর্তৃপক্ষ বলতে থাকল—সব ঠিক আছে। এক বছর পর ধরা পড়ল, শহরের শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেছে। পুরোনো পাইপ থেকে ক্ষয়ে সীসা মিশছিল পানিতে। একই পানি থেকে ছড়ানো লিজিওনেয়ার্স রোগে প্রাণ হারালেন ১২ জন।

কোনো বিস্ফোরণ হয়নি, কোনো সাইরেন বাজেনি। একটি শহর ধীরে ধীরে বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল—তার নিজের কলের পানি দিয়ে। এটাই পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন সত্য—ক্ষতিটা সাধারণত নাটকীয় নয়, নীরব। আর যখন টের পাওয়া যায়, তখন অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে।

শরীরের সীমানা যেখানে শেষ হয় না
আমরা শরীরকে ভাবি একটি বন্ধ জিনিস—চামড়ার ভেতরে যা আছে, সেটাই ‘আমি’। বাস্তবে শরীর একটি খোলা ব্যবস্থা। দিনে প্রায় বিশ হাজার বার আমরা শ্বাস নিই, বাইরের বাতাসকে ভেতরে টেনে নিই। যে পানি পান করি, যে খাবার খাই—সবই বাইরের জগৎ থেকে আসা।

তাই পরিবেশ ভালো রাখা আর শরীর ভালো রাখা দুটি আলাদা কাজ নয়, একই কাজের দুটি নাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞায় স্বাস্থ্য মানে শুধু রোগের অনুপস্থিতি নয়—সম্পূর্ণ শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতা। আর সেই সুস্থতার ভিত্তি তৈরি হয় আমাদের চারপাশের বাতাস, পানি, মাটি আর বসবাসের জায়গা দিয়ে।

সংখ্যাগুলো এই সম্পর্কটাকে স্পষ্ট করে দেয়। প্রতিরোধযোগ্য পরিবেশগত কারণে বিশ্বজুড়ে বছরে ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ অকালে মারা যান—প্রায় প্রতি চারটি মৃত্যুর একটি। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার আরও নির্মম, প্রায় ২৬ শতাংশ। শুধু বায়ুদূষণেই প্রতি বছর ঝরে যায় ৬৪ লাখ প্রাণ।

এগুলো দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নয়। এগুলো আমাদের সম্মিলিত অভ্যাসের পরিসংখ্যান।

বাতাস, যা আমরা নিজেরাই বদলে ফেলেছি
একটি শিশু যখন হাঁপানির টানে রাতে ঘুমোতে পারে না, আমরা বলি ‘অ্যালার্জি’। একজন মানুষ যখন পঞ্চাশে হার্ট অ্যাটাক করেন, আমরা বলি ‘বংশগত’। কিন্তু আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, দূষিত বাতাস ধমনীকে শক্ত ও সংকীর্ণ করে হার্ট অ্যাটাক আর স্ট্রোকের ঝুঁকি সরাসরি বাড়িয়ে দেয়। বাতাসের কণিকাময় পদার্থ ফুসফুসে জমে অ্যাজমা, এমফিসিমা, এমনকি ক্যানসারের পথ তৈরি করে।

দূষণের উৎস আমাদের চেনা জগতেই ছড়ানো—যানবাহন (যা মোট বায়ুদূষণের অর্ধেকেরও বেশির জন্য দায়ী), কলকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, খামার ও কাঠ পোড়ানোর চুলা, আবার দাবানল বা ধুলোঝড়ের মতো প্রাকৃতিক উৎসও।

আর যারা ভাবছেন ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলেই নিরাপদ—সেখানেও আছে ছত্রাক, তামাকের ধোঁয়া, পুরোনো ভবনের অ্যাসবেস্টস, আর রেডন। রেডন অদৃশ্য, গন্ধহীন, মাটির ইউরেনিয়ামের স্বাভাবিক ভাঙন থেকে তৈরি হয়ে মেঝের ফাটল দিয়ে ঘরে জমা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ধূমপানের পর ফুসফুস ক্যানসারের দ্বিতীয় বড় কারণ এই গ্যাসটিই—যাকে আপনি দেখতেও পাবেন না, শুঁকতেও পাবেন না।

যে রাসায়নিক কখনো বিদায় নেয় না
আধুনিক জীবন আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে হাজারো সুবিধা, কিন্তু সাথে দিয়েছে কিছু অনাহূত সঙ্গীও। কৃষিতে ব্যবহৃত হাজারেরও বেশি কীটনাশকের অনেকগুলোই মানুষের জন্য বিষাক্ত। সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকেন মাঠের শ্রমিকেরা, কিন্তু খাবারে থেকে যাওয়া অবশিষ্টাংশের মাধ্যমে আমরাও বাদ পড়ি না—শুধু ধুয়ে বা খোসা ছাড়িয়ে যা পুরোপুরি দূর করা যায় না। বহুল ব্যবহৃত গ্লাইফোসেটকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

তবে সবচেয়ে অস্বস্তিকর নামটি হলো পিএফএএস—প্রায় পাঁচ হাজার রাসায়নিকের একটি পরিবার, যাদের ডাকা হয় ‘ফরএভার কেমিক্যালস’ বা চিরস্থায়ী রাসায়নিক। নামটি রূপক নয়। এরা প্রকৃতিতে ভাঙে না, ক্ষয় হয় না, মাটি-পানি-শরীরে জমতে থাকে। গবেষণা এদের যুক্ত করেছে বন্ধ্যাত্ব, কিডনি ও টেস্টিকুলার ক্যানসার এবং শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যার সাথে।
আমরা যা প্রকৃতিতে ছাড়ি, প্রকৃতি তা সুদে-আসলে ফিরিয়ে দেয়—শুধু সময়টা নিজের মতো করে বেছে নেয়।

গ্রহের হিসাবের খাতা

বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সহনশীলতা মাপতে ব্যবহার করেন ‘প্ল্যানেটারি বাউন্ডারিজ ফ্রেমওয়ার্ক’—জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাদু পানির ভারসাম্য, মহাসাগরের অম্লতা, ওজোন স্তরসহ নয়টি ব্যবস্থার নিরাপদ সীমারেখা। ভাবুন একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কথা, যেখান থেকে সুদটুকু তুলে নিলে চলে, কিন্তু মূলধনে হাত দিলে ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়ে।

২০২৩ সালের হালনাগাদ গবেষণা বলছে, মানব কর্মকাণ্ড ইতিমধ্যেই পৃথিবীকে তার নিরাপদ অঞ্চলের বাইরে নিয়ে গেছে। আমরা এখন মূলধন ভাঙছি।

এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পানিতে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে। আজও বিশ্বের প্রতি চারজনের একজন নিরাপদ পানি পান না। ইউনেস্কোর পূর্বাভাস বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে শহরে পানি সংকটে থাকা মানুষের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন সাথে নিয়ে আসছে নতুন সংক্রামক রোগ আর হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি।

আর এই বোঝা সবার কাঁধে সমানভাবে পড়ে না। পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির ভার সবচেয়ে বেশি বহন করে প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী—যাদের দূষণ সৃষ্টিতে অবদান সবচেয়ে কম। সবার জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত স্থায়িত্ব শব্দটি অসম্পূর্ণই থেকে যায়।

তাহলে আশার জায়গা কোথায়?
এই লেখার উদ্দেশ্য ভয় দেখানো নয়। বরং একটি সহজ সত্য মনে করিয়ে দেওয়া: যে ক্ষতিগুলোর কথা বলা হলো, তার প্রায় সবই ‘প্রতিরোধযোগ্য’। মানুষের সিদ্ধান্তে তৈরি সমস্যা মানুষের সিদ্ধান্তেই বদলানো যায়।

নিজের ঘর থেকে শুরু : কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের পরামর্শগুলো আশ্চর্যরকম সাধারণ—কম কেনাকাটা করা ও সেকেন্ড-হ্যান্ড জিনিস বেছে নেওয়া, সপ্তাহে অন্তত একদিন নিরামিষ খাওয়া ও খাবারের অপচয় কমানো, একবার-ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বদলে বারবার ব্যবহারযোগ্য বোতল-ব্যাগ রাখা, দিনের আলো ও ঠান্ডা পানির ব্যবহার বাড়ানো, আর সম্ভব হলে হাঁটা-সাইকেল-গণপরিবহন বেছে নেওয়া।

পানিকে রক্ষা করা : রান্নার তেল বা গ্রিজ সিঙ্কে না ঢেলে জমিয়ে শক্ত বর্জ্য হিসেবে ফেলা, অব্যবহৃত ওষুধ টয়লেটে ফ্লাশ না করা, ফসফেট-মুক্ত সাবান ব্যবহার করা, সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানো—এগুলো ছোট অভ্যাস, কিন্তু কোটি মানুষ করলে ফল বিশাল।

সতর্ক থাকা : কলের পানির স্বাদ, গন্ধ বা রঙ অস্বাভাবিক লাগলে দ্রুত জানানো ও পরীক্ষা করানো। কীটনাশক ব্যবহারের সময় শিশু-পোষা প্রাণীকে দূরে রাখা, ঢাকা পোশাক পরা।

একা যা করা যায় না : ব্যক্তিগত অভ্যাস জরুরি, কিন্তু যথেষ্ট নয়। ইপিএ-র মতো সংস্থার তৈরি নিয়মকানুন, জাতিসংঘের ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা—এসব কাঠামো আছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আইন থাকাটাই যথেষ্ট নয়, তার কঠোর প্রয়োগই আসল পরীক্ষা। আর সেই প্রয়োগের চাপ তৈরি হয় নাগরিকদের কণ্ঠ থেকে।

প্রতি বছর ২২ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে ধরিত্রী দিবস পালিত হয়, ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ছিল—‘আওয়ার পাওয়ার, আওয়ার প্লানেট’। কিন্তু পরিবেশ কেবল একদিনের বিষয় নয়। বছরের বাকি ৩৬৪ দিন যে বাতাসে আমরা শ্বাস নিই, সেটিই ঠিক করে দেয় আমাদের ফুসফুস কেমন থাকবে; যে পানি পান করি, সেটিই ঠিক করে দেয় আমাদের সন্তান কীভাবে বেড়ে উঠবে।

পরিবেশ সংরক্ষণকে আমরা প্রায়ই ভাবি ত্যাগ হিসেবে—কিছু একটা ছেড়ে দেওয়া, কষ্ট করা, কম নেওয়া। কিন্তু হিসাবটা উল্টো করে দেখলে ছবিটাও বদলে যায়। পরিবেশ রক্ষা আসলে নিজেকে রক্ষা করারই আরেকটি নাম। প্রতিটি পরিচ্ছন্ন নদী মানে কম ডায়রিয়া, প্রতিটি সবুজ শহর মানে কম হাঁপানি, প্রতিটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত মানে আমাদের সন্তানদের জন্য একটু বেশি নিঃশ্বাসের জায়গা।

পৃথিবী আমাদের বিকল্প ঠিকানা নয়, একমাত্র ঠিকানা। তাকে সুস্থ রাখা মানে নিজেদেরই সুস্থ রাখা—এর চেয়ে সরল আর স্বার্থপর কারণ বোধহয় আর হয় না।

তথ্যসূত্র: এনভায়রনমেন্ট হেলথ নিউজিল্যান্ড, কনজিউমার নোটিস, সাউদার্ন নিউহ্যামশায়ার ইউনিভার্সিটি

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *