মার্চের শুরু থেকে ইরানের তেল শোধনাগার, সামরিক ঘাঁটি, শিল্প এলাকা এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হাজার হাজার ইসরায়েলি ও মার্কিন বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। বিনিময়ে ইরানও ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর অভ্যন্তরে অনুরূপ লক্ষ্যবস্তুতে আত্মঘাতী ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

প্রতিটি আঘাতই এক একটি মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়, যা একত্রিত হয়ে একটি বিষাক্ত উত্তরাধিকার তৈরি করবে। এটি আগামী কয়েক দশক ধরে পুরো অঞ্চলকে—বিশেষ করে ইরানকে—বিপর্যস্ত করে তুলবে।

হামলাগুলো এত দ্রুত ঘটছে যে পরিবেশ পর্যবেক্ষকরা সব ঘটনার হিসাব রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। ডাচ শান্তি সংস্থা ‘প্যাক্স’-এর রিমোট সেন্সিং বিশেষজ্ঞ উইম জুইজেনবার্গ বুধবার জানান, তিনি ইতিমধ্যে ইরানের অভ্যন্তরে ৫০০টিরও বেশি এবং বাইরে আরও ১০০টি পরিবেশগত ক্ষতির ঘটনার একটি ডাটাবেস তৈরি করেছেন। রিমোট সেন্সিং হলো স্যাটেলাইট ইমেজ এবং আকাশপথের আলোকচিত্রের মতো তথ্য ব্যবহার করে দূর থেকে পৃথিবীর পৃষ্ঠ বিশ্লেষণ করার প্রক্রিয়া।

জুইজেনবার্গ বলেন, ‌‌‘আমি এখন উচ্চ-দৃশ্যমান প্রভাবগুলোর দিকে নজর দিচ্ছি, যেমন তেলের ডিপোতে হামলা এবং সামুদ্রিক দূষণ।’

হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তু, যার বেশিরভাগই সামরিক, আক্রান্ত হয়েছে; কিন্তু সেগুলোর ভেতরে কী থাকতে পারে সে সম্পর্কে খুব কম জনসমর্থিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

দুই সপ্তাহ আগে যখন তেহরানের জ্বালানি ডিপোগুলোতে বোমা হামলা চালানো হয়, তখন কর্তৃপক্ষ এবং ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি শহরের বাসিন্দাদের ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই অগ্নিকাণ্ড থেকে নির্গত কাঁচকালি, ধোঁয়া, তেলের কণা এবং সালফার যৌগগুলো শহরের ওপর জমে থাকা নিম্নচাপের সাথে মিশে কালো অ্যাসিড বৃষ্টি হিসেবে ঝরে পড়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘কনফ্লিক্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অবজারভেটরি’ জানিয়েছে, যেকোনো অনিয়ন্ত্রিত ধ্বংসই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, তবে সামরিক সাইটগুলোতে হামলা অতিরিক্ত অনেক বিপদের কারণ হতে পারে। তাদের অনলাইন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সম্ভাব্য দূষকগুলোর মধ্যে থাকবে ‘জ্বালানি, তেল, ভারী ধাতু, শক্তিশালী রাসায়নিক যৌগ এবং পিএফএএস (চিরস্থায়ী রাসায়নিক); অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ড থেকে ডাইঅক্সিন এবং ফিউরান নির্গত হতে পারে।’

তবে অনুমানের বাইরে গিয়ে সঠিক প্রভাব নিরূপণ করা কঠিন। ইরান সরকার কোনো পরিবেশগত তথ্য শেয়ার করেনি। সাধারণত, জুইজেনবার্গ স্থানীয় পর্যবেক্ষক বা পরিবেশ কর্মীদের কাছ থেকে মাঠপর্যায়ের আরও তথ্য সংগ্রহ করেন। কিন্তু তিনি বলেন, ‘ইরানে তেমন কোনো কর্মী নেই, কারণ সেখানে পরিবেশগত সক্রিয়তাকে গুপ্তচরবৃত্তির সাথে তুলনা করে দমন করা হয়।’

উপসাগরীয় অঞ্চলের চারপাশে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের সীমার মধ্যে থাকা অরক্ষিত তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলো পুরো অঞ্চলকে এক পরিবেশগত সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যদি এই সংঘাত সরাসরি এই অঞ্চলের জীবাশ্ম জ্বালানি অবকাঠামোর দিকে মোড় নেয়—যার মধ্য দিয়ে (হরমুজ প্রণালী হয়ে) বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়—তবে স্থানীয় পরিবেশ এবং জলবায়ুর জন্য এর ফলাফল হবে বিপর্যয়কর।

ইরান ক্রমাগত সতর্ক করে আসছে যে তাদের অবকাঠামোতে হামলা হলে একই ধরনের পাল্টা জবাব দেওয়া হবে। তবে বুধবার ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরানের ‘সাউথ পার্স’ গ্যাস ফিল্ডে বোমা হামলা চালানোর আগ পর্যন্ত কৌশলগত সংযম বজায় ছিল বলে মনে হচ্ছিল। এরপর কী হবে তা কেউ জানে না।

লেখা : দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *