গত প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলকে যদি কেউ একহাতে শাসন করে থাকে, তবে সেটি স্পেন। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট হোক, ইউরোপীয় ক্লাব প্রতিযোগিতা কিংবা ডাগআউটের কোচিং কৌশল—সব জায়গায় কেবল স্প্যানিশদের জয়জয়কার!

কথায় বলে, “যা কিছু ঘটে, তার পেছনে কারণ থাকে।” ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে স্পেনের শিরোপা জয়ও তাই হঠাৎ পাওয়া কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। বছরের পর বছর ধরে লালন করা ফুটবল দর্শন, নিখুঁত পরিকল্পনা আর মাঠের সুনির্দিষ্ট কৌশলই স্পেনকে এনে দিয়েছে এই ট্রফি।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে একচ্ছত্র রাজত্ব
একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক ফুটবলের লড়াই যখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন, ঠিক তখনই মাঠের সবুজ গালিচায় নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে স্পেনের দল ‘লা রিয়াল ফুরিয়া রেনো’। প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টে তারা শুধু অংশ নিতে যায়নি; গিয়েছে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিয়ে ট্রফি ছিনিয়ে আনতে।

২০০৮ ইউরোতে দীর্ঘ চার দশকের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ট্রফি জেতার পর থেকেই স্পেন ফুটবল বিশ্বের নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২০১২ সালে প্রথম দল হিসেবে ইউরো শিরোপা ধরে রাখার রেকর্ড গড়ে তারা, আর ২০২৪-এ গড়ে তোলে সর্বোচ্চ চারবার ইউরো জেতার অনন্য ইতিহাস।

আর শিরোপা জয়ের সেই পথটাও ছিল দেখার মতো সুন্দর! জার্মানির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ে পাওয়া ২-১ ব্যবধানের জয়টি বাদ দিলে, বাকি সবগুলো ম্যাচেই নির্ধারিত ৯০ মিনিটের মধ্যে জয় তুলে নেয় তারা। পথিমধ্যে ক্রোয়েশিয়া, ইতালি, ফ্রান্সে এবং ইংল্যান্ডের মতো বিশ্বসেরা দলগুলোকে তারা স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছে।

সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেও থামেননি কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তাঁর অপ্রতিরোধ্য দল ২০২৬ বিশ্বকাপে গড়ে তোলে আরেক ইতিহাস। দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পথে পুরো টুর্নামেন্টে তারা গোল হজম করে মাত্র একটি! পর্তুগাল, বেলজিয়াম, ফ্রান্স কিংবা আর্জেন্টিনা—আমেরিকায় অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে স্পেনের এই জয়রথ থামাতে পারেনি কোনো দলই।

ক্লাব ফুটবলেও স্প্যানিশদের দাপট
আন্তর্জাতিক ফুটবলে স্পেনের এই যে রাজত্ব, তার মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছে দেশের দুই পরাশক্তি—বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ।

বিশ্বের সবচেয়ে সফল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ জিতেছে রেকর্ড ১৫টি চ্যাম্পিয়নস লিগ, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শিরোপাধারী দলের চেয়েও ৮টি বেশি! খেয়াল করার বিষয় হলো, ২০০৮ সালে স্পেনের সেই ইউরো জয়ের পর থেকে রিয়াল একাই জিতেছে ৬টি ট্রফি। যেখানে চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসের দ্বিতীয় সফল দল এসি মিলানের মোট শিরোপাই ৭টি!

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও, বার্সেলোনার অর্জিত ৫টি চ্যাম্পিয়নস লিগের ৩টিই এসেছে এই স্প্যানিশ স্বর্ণযুগে। গত ১৭টি চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের ৯টিতেই জয় পেয়েছে এই দুই ক্লাব, যা ইউরোপে তাদের দাপটকে স্পষ্ট করে তোলে।

তবে স্প্যানিশ লিগ ‘লা লিগা’ মানেই কিন্তু শুধু রিয়াল আর বার্সা নয়। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, সেভিয়া এবং ভিয়ারিয়ালও ইউরোপের মঞ্চে স্পেনের নাম উজ্জ্বল করেছে। গত ১৭ বছরে এই তিনটি দল মিলে ৯টি ইউরোপা লিগ জিতেছে। বিশেষ করে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে সেভিয়ার টানা তিনটি ইউরোপা লিগ জয়ের অবিশ্বাস্য ট্রিপল আজও এক অনন্য রেকর্ড!

কোচেদের জাদুকরী মস্তিষ্ক ও ফুটবল দর্শন
স্পেনের এই বিশ্বজয় একদিনে আসেনি। ২০২৫/২৬ মৌসুমে পুরো ইউরোপজুড়েই ছিল স্প্যানিশ কোচেদের জয়জয়কার।

বার্সেলোনার সাবেক মাস্টারমাইন্ড লুইস এনরিকে, জিনেদিন জিদানের পর প্রথম কোচ হিসেবে প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) হয়ে টানা দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েন।

অন্যদিকে, ‘ইউরোপা লিগ বিশেষজ্ঞ’ উনাই এমেরি অ্যাস্টন ভিলাকে উপহার দেন ১৯৮০-এর দশকের পর তাদের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ভিলা হয়তো নতুন চ্যাম্পিয়ন আর্সেনালের চেয়ে ২০ পয়েন্ট পিছিয়ে চার নম্বরে থেকে মৌসুম শেষ করেছে, কিন্তু তাতেও স্পেনের কৃতিত্ব কমেনি। কারণ, সেই রানার্স-আপ আর্সেনালের ডাগআউটেও যে রয়েছেন একজন স্প্যানিয়ার্ড—ম্যাকেল আর্তেতা!

সংক্ষেপে বললে, বিশ্ব ফুটবল এখন যে পথেই হাঁটুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তা গিয়ে মিলছে স্প্যানিশ ফুটবলের চমৎকার সেই দর্শনেই।

তথ্য সূত্র : ইয়াহু স্পোর্টস

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *