
আপনার পকেটের ফোনটি যখন নীরবে কেঁপে ওঠে, তখন ভেতরে যে ক্ষুদ্র চুম্বকটি ঘুরপাক খায়, তার জন্ম সম্ভবত পৃথিবীর এমন কোনো কোণে, যেখানে এই মুহূর্তে গুলি চলছে।
কথাটা নাটকীয় শোনায়, কিন্তু ভূগোলটা নাটকীয় নয়—বরং নিষ্ঠুরভাবে সরল। মিয়ানমারের কাচিন প্রদেশের পাহাড়ি ঢালে খোলা মুখ করে পড়ে থাকা কয়েক শ খনি থেকে যে লালচে কাদা তোলা হয়, তা সীমান্ত পেরিয়ে চীনের ইউনানে যায়, সেখানে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আলাদা হয় ডিসপ্রোসিয়াম আর টারবিয়াম, তারপর সেটি ঢোকে চুম্বকে, চুম্বক ঢোকে মোটরে, মোটর ঢোকে গাড়িতে—কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রে।
গোটা শৃঙ্খলটির এক প্রান্তে বিশ্বের সবচেয়ে ঝকঝকে প্রযুক্তি, অন্য প্রান্তে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ।
‘বিরল’ শব্দটি আসলে একটি ভুল নাম
পর্যায় সারণির নিচের দিকে আলাদা করে বসানো ল্যানথেনাইড সিরিজের ১৫টি মৌল, তার সঙ্গে স্ক্যান্ডিয়াম আর ইত্রিয়াম—মোট সতেরো। একসঙ্গে এদের ডাকা হয় বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ। নামের মধ্যে যে ‘মৃত্তিকা’, সেটি অকারণ নয়; এরা মাটিতেই মেলে।
কিন্তু ‘বিরল’ শব্দটি প্রায় একটি প্রতারণা। ভূত্বকে এদের অনেকেই তামা বা সিসার চেয়ে দুর্লভ নয়। সমস্যা প্রাপ্যতায় নয়, পৃথকীকরণে। এরা প্রকৃতিতে কখনো একা থাকে না—রাসায়নিকভাবে প্রায় যমজ সতেরো ভাই একে অপরের সঙ্গে মিশে থাকে, আর তাদের আলাদা করতে লাগে অ্যাসিডের দীর্ঘ, বিষাক্ত, ব্যয়বহুল ধাপ। পরিবেশের সব শর্ত মেনে এই কাজ করতে গেলে খরচ এমন জায়গায় ওঠে যে বাণিজ্যিক যুক্তি ভেঙে পড়ে।
অর্থাৎ ‘বিরল’ আসলে ভূতাত্ত্বিক বিশেষণ নয়, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিশেষণ। যে দেশ পরিবেশের বিল মেটাতে রাজি নয়, বিরলতা তার জন্য অনেক কম বিরল।
সতেরোটি নাম এক নিঃশ্বাসে: স্ক্যান্ডিয়াম, ইত্রিয়াম, ল্যানথেনাম, সেরিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম, নিওডিমিয়াম, প্রোমিথিয়াম, সামারিয়াম, ইউরোপিয়াম, গ্যাডোলিনিয়াম, টারবিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, হলমিয়াম, আরবিয়াম, থুলিয়াম, ইটারবিয়াম ও লুটেসিয়াম। এদের মধ্যে বাণিজ্যিক দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে পাঁচটি—নিওডিমিয়াম, ইউরোপিয়াম, টারবিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম ও ইত্রিয়াম।
গোপন রহস্যটি একটি অসম্পূর্ণ কক্ষপথে
এদের অলৌকিক ক্ষমতার উৎস পরমাণুর ভেতরের একটি অসম্পূর্ণ ‘এফ অর্বিটাল’। সরল করে বললে, এফ অর্বিটালের ইলেকট্রনগুলো শক্তি পেয়ে ওপরের স্তরে উঠে যায়, তারপর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো ছেড়ে দিয়ে আবার নিজের জায়গায় ফেরে। এই ফিরে আসাই স্ক্রিনের লাল-সবুজ, লেজারের তীক্ষ্ণ রশ্মি, ব্যাংকনোটের অদৃশ্য নিরাপত্তা-চিহ্ন।
আর যেহেতু কক্ষপথটি অসম্পূর্ণ, সেখানে একাধিক ইলেকট্রন একই দিকে ঘুরতে পারে অনায়াসে। একমুখী স্পিনের এই সারিবদ্ধতাই চুম্বকত্ব। পদার্থবিজ্ঞানের এই ছোট্ট স্থাপত্যগত খুঁতটুকুই সতেরোটি মৌলকে সভ্যতার কাঁচামালে পরিণত করেছে।
তিন কেজিতে তিন শ কেজি
আধুনিক প্রযুক্তির ইতিহাসকে যদি একটি বাক্যে লেখা হয়, সে বাক্যটি হলো—জিনিস ছোট হয়েছে।
১৯৪৫ সালের প্রথম প্রোগ্রামযোগ্য কম্পিউটার ইনিয়াকের ওজন ছিল মোটামুটি চারটি হাতির সমান। আজ তার চেয়ে বহুগুণ ক্ষমতাধর যন্ত্র মানুষ পকেটে নিয়ে ঘোরে। এই সংকোচনের প্রকৌশলটা অনেকখানি চুম্বকের।
নিওডিমিয়াম-আয়রন-বোরন সংকর দিয়ে তৈরি ৩ কেজির একটি চুম্বক অনায়াসে ৩০০ কেজির বেশি ওজন টেনে তুলতে পারে।
বিশ্বের স্থায়ী চুম্বকের ৯৫ শতাংশের বেশি আজ এই সংকরে গড়া। ফোনের কম্পন, ইয়ারবাডের শব্দ, হার্ডডিস্কের তথ্য, এমআরআই মেশিনের চৌম্বক ক্ষেত্র—সবই এর সন্তান। এর সঙ্গে ডিসপ্রোসিয়াম মেশালে চুম্বকটি তাপ সহ্য করতে শেখে, আর তখনই সে বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটরে বসার যোগ্য হয়। উড়োজাহাজ, জেনারেটর, স্পিড সেন্সর, রাডার ও যোগাযোগ উপগ্রহে জনপ্রিয় আরেক সংকর—সামারিয়াম-কোবাল্ট।
চুম্বকের বাইরেও তালিকা লম্বা
-টারবিয়াম ও ইউরোপিয়াম—মনিটর, টিভি ও ফোনের স্ক্রিনের রং।
-ইত্রিয়াম—ইত্রিয়াম-অ্যালুমিনিয়াম-গারনেট বা ওয়াইএজি লেজারের ভিত্তি; নিওডিমিয়াম জুড়লে সেই লেজার ইস্পাত কাটা থেকে শরীরে ট্যাটু আঁকা পর্যন্ত সব পারে।
-আরবিয়াম—ওয়াইএজির সঙ্গে জুড়ে অস্ত্রোপচারের লেজার। আর ইন্টারনেট? সমুদ্রতলের ফাইবারে তথ্য ছোটে ১৫৫০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে, আরবিয়ামও ঠিক সেই দৈর্ঘ্যেই আলো বিকিরণ করে। পৃথিবীর অবিচ্ছিন্ন সংযোগ এই কাকতালীয় মিলের কাছে ঋণী।
-ল্যানথেনাম—নাইট ভিশন গগলস। সেরিয়াম—পেট্রোলিয়াম পরিশোধন। গ্যাডোলিনিয়াম—পারমাণবিক চুল্লিতে নিউট্রন শোষণ।
আর ভবিষ্যৎ?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের অগ্রগতিতেও এই এফ অর্বিটালের ফাঁকা জায়গাগুলো কাজে লাগতে পারে—কারণ ওই শূন্যতাই বাড়তি তথ্য ধরে রাখার সম্ভাবনা তৈরি করে।
বায়ুকল আর সৌর প্যানেল—জলবায়ু সংকটের মুখে পৃথিবীর যে দুটি প্রতিশ্রুতি—দুটিই এই সতেরোজনের ওপর দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ পৃথিবীকে বাঁচানোর প্রযুক্তিটিও একটি খনিজের ওপর নির্ভরশীল, যে খনিজ তুলতে গিয়ে পাহাড় কেটে ফেলতে হয়। দ্বন্দ্বটি এখানেই।
৪০০ কোটির বাজার, যার হাতে কয়েক লাখ কোটি
কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন—এত হইচই কেন? বিরল খনিজের নিজস্ব বাজার তো সম্প্রতি ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে মাত্র। বিশ্ব-অর্থনীতির মানদণ্ডে এ প্রায় কিছুই নয়।
ঠিক এখানেই ভুলটা হয়। বিরল খনিজের মূল্য তার নিজের দামে নয়, তার জিম্মি করার ক্ষমতায়।
ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের হিসাবে, ২০২৯ সাল নাগাদ বৈশ্বিক স্মার্টফোনের বাজার দাঁড়াবে প্রায় ৭৯ হাজার ২৫১ কোটি ডলারে।
স্ট্যাটিস্টা বলছে, একই সময়ে গৃহস্থালির ছোট স্মার্ট ডিভাইসের বাজার হবে প্রায় ২৫ হাজার কোটি ডলারের।
বৈদ্যুতিক গাড়ির বৈশ্বিক বাজার ২০২৫ সালেই ছাড়িয়ে যাবে ৭৮ হাজার কোটি ডলার, যার মধ্যে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি ডলারই চীনের নিয়ন্ত্রণে।
কম্পিউটার-ল্যাপটপের বাজার এখনই ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি, বছর শেষে যা ৫০ হাজার কোটির কাছাকাছি পৌঁছাবে।
এর সঙ্গে যোগ করুন চিকিৎসা সরঞ্জাম, যোগাযোগ অবকাঠামো আর প্রতিরক্ষাশিল্প। একটি ৪০০ কোটি ডলারের কাঁচামাল কয়েক লাখ কোটি ডলারের উৎপাদনশৃঙ্খলের গলার কাছে ছুরি ধরে বসে আছে। ভালভের দাম পাইপলাইনের দামের সমান হয় না—কিন্তু ভালভ যার হাতে, প্রবাহ তার নিয়ন্ত্রণে।
ওপেকের চেয়েও টান-টান একটি মুঠো
বিংশ শতাব্দীকে চিনতে হলে তেল বুঝতে হতো। জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের নিয়ন্ত্রণে আছে বিশ্বের তেলবাজারের ৪১ শতাংশ—আর এই ৪১ শতাংশ দিয়েই দশকের পর দশক গোটা দুনিয়ায় ছড়ি ঘোরানো গেছে।
এবার একুশ শতকের সংখ্যাগুলো দেখুন। বিশ্বের মোট বিরল খনিজ আকরিকের ৬০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাটের তথ্যমতে, আকরিক উৎপাদনের ৮৫ শতাংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে। আর আকরিক থেকে প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদনের হিসাব ধরলে সেই নিয়ন্ত্রণ ৯৫ শতাংশ।
৪১-এর বিপরীতে ৯৫। ওপেক যা পারেনি, চীন তা নিঃশব্দে করে ফেলেছে—এবং বহুলাংশে তা করেছে পরিবেশগত ঝুঁকি আর নোংরা কাজটুকু নিজের কাঁধে (এবং প্রতিবেশীর কাঁধে) তুলে নিয়ে, যখন পশ্চিম সেই কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আর জলবায়ু পরিবর্তনকে যতই গুজব বলে উড়িয়ে দিন, তার প্রশাসনও জানে—জ্বালানি রূপান্তর ছাড়া সামনের পৃথিবীতে টিকে থাকা কঠিন। ইলন মাস্কও জানেন, বিরল খনিজের নির্ভরযোগ্য ভান্ডার নিশ্চিত না করতে পারলে টেসলার রাজত্ব চিরস্থায়ী নয়।
মানচিত্রের একটি সন্দেহজনক সাদা দাগ
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজউইক বিশ্বজুড়ে বিরল খনিজের মজুতের একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছিল, যেখানে সর্বোচ্চ মজুতের অঞ্চলগুলো গাঢ় খয়েরি রঙে চিহ্নিত। ভারত ও চীন—দুটোই গাঢ় খয়েরি।
আর ঠিক এই দুই বিশাল খয়েরি অঞ্চলের মাঝখানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একেবারে রংহীন, সাদা।
ভূতত্ত্বের দিক থেকে এই সাদা দাগটি অস্বস্তিকর। ভারতের পরমাণু শক্তি কমিশনের তথ্য বলছে, কেরালা, তামিলনাড়ু, ওডিশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের উপকূলীয় বালুতে বিরল খনিজের বড় মজুত রয়েছে; ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর মধ্যবর্তী ভূমিতেও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি আছে। ভারতের মোট মজুত প্রায় ৬৯ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়াম ভালো পরিমাণে মিললেও ডিসপ্রোসিয়াম ও টারবিয়াম তুলনামূলক কম।
লক্ষ্য করুন, ভারতের মজুতের বড় অংশই উপকূলীয় বালুতে। সেই উপকূলরেখা তো বঙ্গোপসাগরের কিনার ঘেঁষে বাংলাদেশ হয়ে আরাকান উপকূলে গিয়ে ঠেকেছে। ভূগঠন রাজনৈতিক সীমানা মেনে চলে না—সে চলে নিজের নিয়মে। মানচিত্রে কক্সবাজার বা রাখাইন সাদা হতে পারে কাগজে-কলমে, পরিসংখ্যানে; বাস্তব অনুসন্ধানে নয়।
এই যুক্তির পক্ষে একটি নজিরও আছে। গ্রিনল্যান্ডে ১৫ লাখ মেট্রিক টনের মজুত পাওয়ার পর একই ভূগঠনের অঞ্চলগুলোয় পশ্চিমা অনুসন্ধান তীব্র হয়, এবং ধারণা করা হচ্ছে—একই প্লেটের আওতাধীন নর্ডিক দেশগুলোতেও ভালো মজুত আছে। সুইডেনে ইতিমধ্যেই আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত মিলেছে।
অর্থাৎ সাদা দাগ মানে শূন্যতা নয়। সাদা দাগ মানে—কেউ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে খোঁজেনি, কিংবা খুঁজে পাওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলেনি।
কাচিনের সাতশ বর্গকিলোমিটার
মিয়ানমারের ঘোষিত মজুত শূন্য। অথচ উৎপাদনে দেশটির অবস্থান চীনের ঠিক পরেই। এবং সেই উৎপাদনের কার্যত পুরোটাই যায় চীনে।
খাতাপত্রে যা নেই, কাস্টমসের হিসাবে তা প্রবলভাবে আছে। চীনের শুল্ক প্রশাসনের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে মিয়ানমার থেকে চীন ৪০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি বিরল খনিজ আমদানি করেছে; রয়টার্সের হিসাবে ২০২৪ সালে সেই পরিমাণ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ছাড়িয়েছে। ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটি ও কাচিনল্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের এক গবেষণাপত্র বলছে, ২০২৩ সালেই মিয়ানমার চীনে ১৪০ কোটি ডলারের বিরল খনিজ রপ্তানি করেছে—এবং এটি কেবল প্রদর্শিত পথের হিসাব।
কাজটা কীভাবে হয়, তার একটি চিত্র দিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল উইটনেস। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে ২০২২ সালে তারা কাচিনের কেবল দুটি এলাকাতেই তিন শতাধিক বিরল খনিজের খনি শনাক্ত করে—মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে। ঢাকা শহরের চেয়ে সামান্য বড় একটি এলাকায় তিন শ খনি। উত্তোলন হয় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে, যেখানে পাহাড়ের গা কেটে অ্যাসিড ঢেলে খনিজ ধুয়ে নামানো হয়। নদী মরে, মাটি বিষিয়ে যায়, মানুষ সরে যেতে বাধ্য হয়।
এই খনি অঞ্চল চীনের ইউনান প্রদেশের গা ঘেঁষে—সীমান্ত থেকে ট্রাক চলে যায় প্রক্রিয়াকরণ কারখানায়। ভূগোলটি নিখুঁত: নোংরা কাজটি সীমান্তের ওপারে, মুনাফা এপারে।
আগে এই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করত জান্তা সরকারের অনুগ্রহপুষ্ট এনডিএ-কে গোষ্ঠী, যারা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে খনি এলাকায় কাজ করতে সাদরে ডেকেছিল।
গত বছরের ২৩ অক্টোবর জান্তাবিরোধী কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মি (কেআইএ) দাবি করে, তারা কাচিনের পানওয়া ও চিপবে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ঠিক এই দুই এলাকাতেই বিরল খনিজের খনিগুলোর অবস্থান।
এরপর প্রশ্নটি আর সামরিক থাকে না, বাণিজ্যিক হয়ে যায়: কেআইএ কি আগের গোষ্ঠীর মতোই চীনের সঙ্গে কাজ করবে?
দূর থেকে তাকিয়ে থাকা চোখ
মিয়ানমারে আজ ২৫টিরও বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়, তাদের মধ্যে আবার জোট আছে, জোটের ভেতরে দ্বন্দ্ব আছে, দ্বন্দ্বের ভেতরে আপসরফা আছে। আরাকান আর্মি রাখাইন, চিন, কাচিন ও শান—চার প্রদেশেই নানা মাত্রায় সক্রিয় এবং জোটবদ্ধ। সম্পদের ভাগ-বাটোয়ারা এই জোট-দ্বন্দ্বের মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আর দূরে বসে সেই ভাগের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে কয়েকটি রাজধানী।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের ২০২২ সালের একটি প্রতিবেদন বলছে, মিয়ানমারে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কার্যত যুযুধান অবস্থানে। ইতিহাসটা সংক্ষেপে এমন—আশির দশকে সামরিক শাসন কায়েমের পর প্রায় দুই দশক মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বোঝা টেনেছে মিয়ানমার। তারপর অসামরিক সরকার এল, ২০১২ সালে ওবামা প্রশাসন সম্পর্ক নবায়ন করে ২২ বছরের মধ্যে প্রথমবার রাষ্ট্রদূত পাঠাল; ওবামা নিজে দুবার দেশটি সফর করলেন। ২০১৫ সালের নির্বাচনের পর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পূর্ণ প্রত্যাহার হলো।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পও এই ধারাবাহিকতা ভাঙেননি—কারণ ওয়াশিংটনের হাতে তখন একটি তুরুপের তাস ছিল, অং সান সু চি। রোহিঙ্গা সংকটের বাস্তবতার পরও যুক্তরাষ্ট্র তাই কিছু ঘোষণাসর্বস্ব নিষেধাজ্ঞার বাইরে যায়নি।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানে সু চি ক্ষমতাচ্যুত হলে ছবিটা উল্টে গেল। চীন ও রাশিয়া জান্তাকে প্রকাশ্যে না হলেও কার্যত স্বীকৃতি দিল—মস্কো হলো সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগী, আর বেইজিং তো বহু বছর ধরেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র আসিয়ানসহ সবাইকে জান্তার ওপর চাপ দিতে বলল, জান্তাবিরোধী ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টকে (এনইউজি) প্রকারান্তরে স্বীকৃতি দিল, আর্থিক সহায়তা দিল; কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের তথ্যমতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান এনইউজির সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকও করলেন। মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া বার্মা অ্যাক্ট-২০২২ এনইউজিকে স্বীকৃতি দিয়ে জান্তা সরকারকে সরাসরি বেআইনি ঘোষণা করল।
চীনের তালিকায় অবশ্য বিরল খনিজই একমাত্র আইটেম নয়। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, চীন-মিয়ানমার তেল-গ্যাস পাইপলাইন, আর ইউনান থেকে রাখাইনের ভেতর দিয়ে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত চায়না-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর—এই সবই মিয়ানমারের মানচিত্রের ওপর দিয়ে টানা।
মানচিত্রে দাগগুলো বসিয়ে দেখুন। ইউনান ঘেঁষা কাচিন ও চিন—খনিজে ঠাসা। করিডরের মুখ—রাখাইন। আর এই তিনটি প্রদেশই মিয়ানমারের সবচেয়ে রক্তাক্ত অঞ্চল।
রাখাইনের প্রশ্নটি অস্বস্তিকর, কিন্তু এড়ানো কঠিন
রাখাইনে বিরল খনিজ আছে কি না, তার কোনো ঘোষিত প্রমাণ নেই। এ নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা হবে।
কিন্তু কয়েকটি বিষয় পাশাপাশি রাখলে একটি প্রশ্ন আপনা থেকেই তৈরি হয়। উপকূলীয় বালুতে বিরল খনিজের ভারতীয় মজুতের ধরন; একই উপকূলরেখার ধারাবাহিকতা; মিয়ানমারের ঘোষিত মজুত শূন্য অথচ উৎপাদনে দ্বিতীয় হওয়ার নজির; চীনের করিডর ঠিক এই অঞ্চল দিয়ে যাওয়া; এবং জাতিগত নিধনের মধ্য দিয়ে সেখান থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাপ্রবাহ।
উন্মুক্ত পদ্ধতির খনি চালাতে হলে যা সবচেয়ে বেশি দরকার, তা প্রযুক্তি নয়—জনশূন্য জমি। এই বাক্যটি রাখাইনের ক্ষেত্রে প্রমাণ নয়, কিন্তু এটি একটি অস্বস্তি, যা সহজে ঝেড়ে ফেলা যায় না।
সম্পদই যখন অভিশাপ
অর্থনীতিবিদেরা একে বলেন রিসোর্স কার্স—সম্পদের অভিশাপ। মাটির নিচে যা মূল্যবান, মাটির ওপরে তা প্রায়ই রক্তাক্ত।
মিয়ানমার এই তত্ত্বের পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ হয়ে উঠছে। দেশটির খনিজভান্ডার তার সৌভাগ্য হতে পারত; হয়েছে তার কারাগার।
প্রতিটি খনির চারপাশে গড়ে উঠেছে একেকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, প্রতিটি গোষ্ঠীর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একেকটি বিদেশি স্বার্থ, আর প্রতিটি স্বার্থের পেছনে রয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি কারখানা, যেখানে সতেরোটি মৌলের কোনো একটিকে চুম্বকে পরিণত করা হচ্ছে।
দোষ কেবল বাইরের নয়। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও লোভ না থাকলে বাইরের হাত এত সহজে ভেতরে ঢুকতে পারত না। সব উপনিবেশেরই একজন স্থানীয় দারোয়ান লাগে।
বিশ শতকের পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করেছে যারা তেলের ভান্ডার, পরিবহন ও দাম নিয়ন্ত্রণ করত। একুশ শতকের পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করবে তারাই, যাদের হাতে থাকবে এই সতেরোটি নাম।
পার্থক্য একটাই—তেলের যুদ্ধগুলো আমরা যুদ্ধ বলেই চিনতাম। বিরল খনিজের যুদ্ধটি চলছে নিঃশব্দে, খনির অনুমতিপত্রে, কাস্টমসের ঘোষণাপত্রে, আর দূর পাহাড়ের এমন সব গ্রামে—যাদের নাম খবরের কাগজে ওঠার আগেই মানচিত্র থেকে মুছে যায়।
তথ্যসূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট, রয়টার্স, নিউজউইক, গ্লোবাল উইটনেস, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স, ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটি ও কাচিনল্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, ভারতের পরমাণু শক্তি কমিশন, ফরচুন বিজনেস ইনসাইটস, স্ট্যাটিস্টা, মাইনিং ডটকম, সায়েন্সনিউজ।
























