
ইতিহাসে এমন দৃশ্য আগে খুব কমই দেখা গেছে। প্রায় প্রতিটি প্রযুক্তি-বিপ্লবে কোম্পানিগুলো নিজ নিজ পথে ছুটেছে। ইন্টারনেট যুগের শুরুতে অ্যামাজন বই বেচে ই-কমার্সের ভিত গড়ছিল, গুগল তৈরি করছিল সার্চ ইঞ্জিন। ১০ বছর পর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ফেসবুক, টুইটার মানুষকে জুড়ে দেওয়ার নতুন উপায় খুঁজছিল। তারও পরে উবার আর এয়ারবিএনবি এল ট্যাক্সি আর হোটেলের জগৎ বদলে দিতে। অ্যাপল তখন ব্যস্ত স্মার্টফোন নিয়ে। সবার গন্তব্য ছিল আলাদা আলাদা।
আজকের দিনে দৃশ্যটা ঠিক উল্টো। যে স্পেসএক্স রকেট বানাত, সে এখন এআই বানাচ্ছে। গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট, সবার চোখ এখন একই দিকে—এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কেউ নিজে মডেল বানাচ্ছে, কেউ বা মডেল-নির্মাতাদের রসদ জোগাচ্ছে। চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া যেমন নিজে মডেল বানায় না, কিন্তু যারা বানায় তাদের প্রায় সবাইকে সরঞ্জাম দিচ্ছে।
এর আঁচ এখন আমাদের পকেটেও লাগছে। প্লেস্টেশন আর ফোনের দাম বাড়ছে, কারণ চিপের সংকট। চিপ যে কম তৈরি হচ্ছে, তা নয়। উৎপাদন বরং বাড়ছে। কিন্তু তার প্রায় পুরোটাই চলে যাচ্ছে এআই কোম্পানিগুলোর ডেটা সেন্টারে। ইলন মাস্ক যখন বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে মহাকাশেই ডেটা সেন্টার বসবে, তখন আর কথাটাকে পাগলের প্রলাপ মনে হয় না। পানি ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে বিতর্ক চলছে, তবু নির্মাণ থামছে না।
সমুদ্রের ঝড়ের ঠিক মাঝখানে পড়লে মানুষ টের পায় না যে সে ঝড়ে আছে। ঝড় চেনা যায় দূর থেকে। আমরা এআই-এর ঝড়ের এতটাই গভীরে আছি যে চারপাশে কী ঘটছে, আর ব্যাপারটা আসলে কতটা ভয়ংকর, তা ধরতেই পারছি না।
গত দেড় বছর ধরে শুনছি, সফটওয়্যার মৃত। এখন শোনা যাচ্ছে, সেবাখাতও মরছে। সহজ করে বলি। সফটওয়্যার মানে এমন কিছু, যা ডিজিটাল দুনিয়ায় আমাদের কাজ সারতে সাহায্য করে। জিমেইল, গুগল ড্রাইভ বা আইক্লাউড সহজে মরবে না। কিন্তু বাজারের বড় অংশ এরা নয়। অর্থনীতির সত্তর-আশি ভাগ যেমন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের দখলে, সফটওয়্যারের জগৎও তেমনই ছোট-মাঝারি টুলে ভরা। জিরো, কুইকবুকস, জ্যাপিয়ার, এমন লাখ লাখ প্রোগ্রাম, যাদের প্রতিটি একটি ছোট সমস্যা মেটায়। এদের অনেকেই এখন কর্মী ছাঁটাই করছে, গ্রাহক হারাচ্ছে, নতুন গ্রাহকও পাচ্ছে না।
কারণ সহজ। মানুষ নিজের টুল নিজেই এআই দিয়ে বানিয়ে নিচ্ছে। সেই টুল একশো ভাগ নিখুঁত না হতে পারে, কিন্তু আশি-নব্বই ভাগ কাজ চলে যায়। বাকি দশ-বিশ ভাগের জন্য মোটা বিল দেওয়ার যুক্তি আর টেকে না।
সেবার ক্ষেত্রেও একই কথা। ধরুন, সামাজিক মাধ্যমের ছবির জন্য একজন গ্রাফিক ডিজাইনার রেখেছেন। এখন ক্যানভার সঙ্গে ক্লডকে জুড়ে, নিজের পছন্দের দুই-তিন হাজার ছবি দিয়ে যত্ন করে শিখিয়ে নিলে ডিজাইনারের কাছাকাছি মানের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক। জেমিনি বা চ্যাটজিপিটিতে একটা প্রম্পট দিয়ে ছবি বানানোর কথা বলছি না। বলছি মন দিয়ে করা কাজের কথা।
এবার ব্যবসায়ীর চোখে হিসাব করুন। নব্বই ভাগ মানের ডিজাইনের জন্য মাসে পাঁচশো টাকা খরচ, নাকি সত্তর ভাগ মানের ডিজাইন বিনা খরচে? শিল্পীর মন নিয়ে নয়, ব্যবসায়ীর মন নিয়ে ভাবুন। আর যে গ্রাহক ছবিটা দেখছেন, তিনি তো সারাদিনই এআই-এর বানানো ছবি আর ভিডিওর স্রোতে ভাসছেন। এসব নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই।
এই মাথাব্যথাহীনতার একটা নাম আছে— গ্রহণযোগ্যতা। তিন বছর আগে কোনো ইউটিউবার ভিডিওতে এআই-এর বানানো দৃশ্য ব্যবহার করলে একশো মন্তব্যের তিরিশটাই বলত, এটা তো এআই! এখন সেই সংখ্যা দুই-তিনে নেমে এসেছে। প্রতিটি নতুন পণ্যের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটে।
২০১২ সালে সারাদিন ফোনে ভিডিও দেখলে বাবা-মা বকতেন, বন্ধুরা পাগল ভাবত। আজ সেটাই স্বাভাবিক। এআই-এর কাজও স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, আর স্বাভাবিক জিনিসের খুঁত ধরতে মানুষ আর উৎসাহ পায় না। তা ছাড়া এআই-এর বেশিরভাগ কাজ চোখে পড়ার মতো দৃশ্যমান নয়।
এআই-এর দুনিয়ায় একটা ঢেউ আসতে না আসতেই আরেকটা তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। দুই বছর আগে সবাই প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং শিখতে ছুটছিল। আমি তখনই বলেছিলাম, এটা আসলে ইঞ্জিনিয়ারিং নয়, এআই নিজেই কিছুদিনে এ কাজ শিখে নেবে। তা-ই হয়েছে। ভালো প্রম্পটের দাম এখনো আছে, কিন্তু প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে আজ কেউ কথা বলে না। এরপর এল এআই অটোমেশনই ভবিষ্যৎ হাওয়া। লিন্ডি আর জ্যাপিয়ার না শিখলে নাকি জীবন বরবাদ! অথচ আজ সেই কাজ এআই-এর ভেতরেই হয়ে যায়। তারপর এল এজেন্টের যুগ।
গ্রক আর মিউজ এসে আরও সহজে, আরও ভালোভাবে সেই কাজ করে দিচ্ছে। এআই নিজেই নিজের পূর্বসূরিকে গিলে খাচ্ছে। ক্লড কিছু বের করে, দুই সপ্তাহ পর চ্যাটজিপিটি আরেকটা এনে তাকে ছাড়িয়ে যায়।
এই সবকিছুর মাঝে আমি দুটি নির্মম সত্য বলতে চাই।
প্রথম সত্য—বানানো এখন ইতিহাসের সবচেয়ে সহজ কাজ। এই সহজতার দুটি দিক আছে। ভালো দিক হলো, মাথায় আইডিয়া থাকলে তাকে বাস্তবে নামানো এখন ডালভাত। খারাপ দিক হলো, চালু করা আর সফল হওয়া এক জিনিস নয়। অথচ চালুর আনন্দে সফলতার একটা মিথ্যে মায়া তৈরি হয়। যে অ্যাপ কেউ ব্যবহারই করে না, তাতে আমার অর্জন কী? আর এআই যা বানিয়ে দেয়, যার হাতে এআই আছে সেও তা বানাতে পারে।
সত্যিকারের সাফল্য আসে দুই পথে। হয় এমন কিছু বানাতে হবে, বাজারে যার সত্যিই চাহিদা আছে। নয়তো মার্কেটিং আর বিতরণে এত দক্ষ হতে হবে যে সাদামাটা পণ্যও লাখো মানুষের হাতে পৌঁছে যায়। কোনোটাই না থাকলে শুধু বানানোর জন্য বানানো অর্থহীন। সোশ্যাল মিডিয়ায় রোজই কেউ না কেউ নতুন কিছু বানিয়ে দেখাচ্ছে। মজা হিসেবে ঠিক আছে, কিন্তু তাতে না আসবে আসল সাফল্যের অনুভূতি, না আর্থিক সাফল্য।
অর্থনীতির সূত্র সোজা—জোগান বাড়লে দাম কমে। চাইলে এক ঘণ্টায় পঞ্চাশটা ওয়েবসাইট, চব্বিশ ঘণ্টায় বিশটা ভালো মানের জিনিস, কিংবা এক বসায় ত্রিশ দিনের কন্টেন্ট বানিয়ে ফেলতে পারি। জোগান যখন এত বেশি, তখন মানুষের নজরে পড়াই সবচেয়ে কঠিন কাজ। তাই আমার পরামর্শ, সময় আর শক্তির আশি ভাগ দিন মার্কেটিং আর বিতরণে।
দ্বিতীয় সত্য—আগামী দুই-তিন বছরে প্রতিযোগিতা চরমে উঠবে। রেঅফসের ওয়েবসাইটে গেলে দেখবেন, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চাকরি হারাচ্ছেন। মেটার মতো বড় কোম্পানির ছাঁটাই শিরোনাম হয়। কিন্তু অচেনা কোম্পানিগুলোর তিন-পাঁচজন করে ছাঁটাই খবর হয় না, অথচ সংখ্যায় তারাই বেশি। এই মানুষগুলো তো চিরদিন বেকার থাকবেন না। তারা আবার আবেদন করবেন, আপনি যে চাকরির জন্য করছেন ঠিক সেটিতেই, তবে অনেক বেশি যোগ্যতা নিয়ে। তখন চাকরিটা যাবে ওই যোগ্যতর মানুষের কাছে, নয়তো এআই-এর কাছে, নয়তো কারো কাছেই নয়। আপনার সুযোগ কম, আর দিন যত যাবে, পরিস্থিতি তত কঠিন হবে।
তাহলে উপায় কী? আমি তিনটি হাতিয়ারের কথা বলব।
প্রথম হাতিয়ার আস্থা। একটা কথা মনে রাখবেন, উদাসীনতাই সবচেয়ে খারাপ অবস্থা। কেউ আপনাকে পছন্দ করুক বা অপছন্দ, ক্ষতি নেই। কিন্তু ও আছে পৃথিবীতে, তো কী? গোছের নির্বিকার ভাব যেন কখনো তৈরি না হয়।
দ্বিতীয় হাতিয়ার বিতরণ আর মার্কেটিং, সঙ্গে কম বানানো। আমি জানি আপনার হাত নিশপিশ করছে। ক্লড আছে, জিপিটি আছে, একটা প্রম্পট দিলেই ওয়েবসাইট তৈরি। কিন্তু ওই পথে ছুটলে শেষ পর্যন্ত কিছুই মিলবে না। বানাবেন, তবে সতর্ক হয়ে, অল্প করে।
তৃতীয় হাতিয়ার আর্বিট্রেজ, অর্থাৎ জানার ফারাক থেকে সুযোগ নেওয়া। এআই নিয়ে আপনি বা আমি এমন অনেক কিছু জানি, যা অনেকেই জানে না। সেই ফারাকই এখন সুযোগ। কিন্তু এই জানালা চিরকাল খোলা থাকে না, বড়জোর কয়েক বছর। একসময় ওরাও শিখে ফেলবে, তখন আপনাকে আর দরকার হবে না, ব্যবসাও ধসে পড়বে। আর্বিট্রেজ ভালো, কিন্তু টেকসই নয়।
সামনের বছরগুলো, ২০২৭, ২০২৮ আর ২০২৯, হতে চলেছে অফলাইনের স্বর্ণযুগ। প্রকৃতির নিয়মে থিসিসের পেছনে আসে অ্যান্টিথিসিস। মোবাইল ফোন সর্বগ্রাসী হয়েছে বলেই আজ সাধারণ ফিচার ফোন আর নো-ফোন কোম্পানিগুলো মাথা তুলছে। সবাই যখন দিনভর ডিজিটাল পর্দায় ডুবে থাকবে, তখন অ্যানালগ জীবনের জোয়ার আসবে। আমার ধারণা, আগামী কয়েক বছরের বড় ব্যবসা আর স্টার্টআপের বেশিরভাগই হবে অফলাইন-প্রথম। কেউ গেমিং ইভেন্ট করবে, কেউ অফলাইন ডেটিং শো, কেউ বড় পরিসরে স্ট্যান্ড-আপ কমেডি। কেউ গড়বে বিষয়ভিত্তিক কমিউনিটি, কেউ রিট্রিট বা ভ্রমণের আয়োজন। এটা বড় সুযোগ, তবে মনে রাখবেন, এটাও এক ধরনের আর্বিট্রেজ।
সবশেষে একটা কথা: কখনো ভাববেন না, এআই এটা পারবে না। তিন বছর আগে এআই শুধু কুৎসিত, বেসিক ওয়েবসাইট বানাত। দুই বছর আগে ভালো ওয়েবসাইট বানাত, কিন্তু ব্যাকএন্ড পারত না। এক বছর আগে সুন্দর ব্যাকএন্ডসহ বাজারজাত করার মতো সফটওয়্যার বানিয়ে ফেলল, আর মানুষ তা দিয়ে লাখ লাখ টাকা আয় করছে। কয়েক মাস আগেও শুনতাম, এআই দিয়ে ভিডিও এডিটিং হয় না। এখন সেই লোকেরাই বলছে, হয়, তবে ভালো হয় না। ছয় মাস পর তারা নতুন অজুহাত খুঁজবে।
একটা পণ্যের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ ওঠে, তা থেকেই বোঝা যায় সেটা কত শক্তিশালী। গণিতবিদদের শীর্ষ দশ সমস্যার তিন-চারটা এআই এখনো সমাধান করতে পারেনি, এ কথা যেন বলা, পরমাণু বোমা একসঙ্গে তিনটা শহর ওড়াতে পারেনি, মাত্র একটা পেরেছে। অভিযোগের ভঙ্গিতেই আপনি আসলে ক্ষমতার স্বীকৃতি দিয়ে ফেলছেন। ওসব তর্কে আমরা ঢুকব না, কারণ তার ওপর আমাদের হাত নেই।
আমাদের করণীয় তাই তিনটি। আস্থা, বিতরণ আর মার্কেটিংয়ে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া। বানানোর পেছনে কম সময় খরচ করা। আর আর্বিট্রেজের সুযোগ খুঁজে বের করা, সেটা অফলাইন হোক বা এআই-সংক্রান্ত, যা আপনি জানেন আর অন্যরা জানে না।
সামনে এক অন্ধকার সময়। হাসিমুখে বলুন বা দুঃখ নিয়ে, এটাই নিষ্ঠুর সত্য, আর আমরা সবাই তার ভেতরে ঢুকতে চলেছি। যে যত প্রস্তুতি নিয়ে ঢুকবে, ঝড়ের ধাক্কা তার ওপর তত কম পড়বে। এটুকুই আশা করা যায়।



