
কল্পনা করুন, একটি গাড়ি ঢালু পথ বেয়ে উঠছে। উঠতে উঠতে সে ছাদের দিকে চলে গেল, চাকা ওপরে, ছাদ নিচে। কিন্তু পড়ল না। গাড়িটি যেন ছাদের সঙ্গে সেঁটে রইল।
গত ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ওয়াকোর কাছে ঠিক এই দৃশ্যই দেখাল টেসলা। দ্বিতীয় প্রজন্মের রোডস্টার র্যাম্পে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকল। সংকুচিত বাতাসের জেটে মাটি ছেড়ে উঠল। আর ০.৮১ সেকেন্ডে শূন্য থেকে ৬০ মাইল গতি তুলল। চোখ ছানাবড়া হওয়ার মতোই ঘটনা।
অনেকের মনে হয়েছে, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম বুঝি ভেঙে ফেলা হলো। আসলে তা হয়নি। গাড়িটি বরং কয়েকটি পুরোনো ও পরিচিত সূত্রকে খুব চতুরভাবে কাজে লাগিয়েছে।
পুরো গাড়ির মূলে আছে দুটি ধারণা। প্রথমটি ফ্যান, যা গাড়িকে রাস্তার সঙ্গে চেপে ধরে, ফলে টায়ারের আঁকড়ে ধরার ক্ষমতা বাড়ে। দ্বিতীয়টি থ্রাস্টার, যা বাতাসকে ঠেলে গাড়িকে সামনে নেয়, তাই এখানে টায়ারের আঁকড়ে ধরার দরকারই পড়ে না।
প্রথমে জেনে নিই গাড়িটির পরিচয়। রোডস্টার আসবে তিনটি রূপে। পারফরম্যান্স রূপে আছে ফ্যান। থ্রাস্ট রূপে পেছনে যুক্ত হয়েছে থ্রাস্টার। আর শুধু আমন্ত্রণে পাওয়া রকেট রূপে থ্রাস্টার আছে চারদিকে। এটি উড়তে পারে, তবে সড়কে চলার অনুমতি নেই। শূন্য থেকে ৬০ মাইল গতি তুলতে এই তিন রূপের সময় লাগবে যথাক্রমে ১.৬ সেকেন্ডের কম, ০.৯ সেকেন্ডের কম এবং ০.৫৯ সেকেন্ডের কম।
টেসলা জানিয়েছে, গাড়িতে ১০টি থ্রাস্টার ৬০০ লিটার সংকুচিত বাতাস থেকে চলে এবং সব মিলিয়ে ৮০ কিলোনিউটনের বেশি বল তৈরি করে। গাড়িটি পেছনের চাকায় চলে, পেছনে দুটি মোটর। উৎপাদনের লক্ষ্য ২০২৮ সাল।
এবার আসল গল্পে আসি। সব শুরু টায়ারকে নিয়ে। টায়ার গাড়িকে এগিয়ে নেয় রাস্তাকে পেছনে ঠেলে। রাস্তাও ততটাই জোরে ঠেলে ফেরত দেয়। কিন্তু এই ঠেলার একটা সীমা আছে। ঘর্ষণের সূত্র বলে, সীমাটি হলো ঘর্ষণ সহগ আর টায়ারের ওপর চাপের গুণফল। সমতল রাস্তায় এই চাপ গাড়ির নিজের ওজন। নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী বলকে ভর দিয়ে ভাগ করলে ওজন কেটে যায়। তখন সর্বোচ্চ ত্বরণ দাঁড়ায় ঘর্ষণ সহগ আর অভিকর্ষজ ত্বরণের গুণফল। এর মানে, গাড়ি যত শক্তিশালীই হোক, শুধু টায়ারের ভরসায় এই সীমা পার হওয়া যায় না।
টেসলার লার্স মোরাভির মতে, টায়ার একা দিতে পারে প্রায় ১.২৬ জি। জি মানে অভিকর্ষের সমান ত্বরণ, অর্থাৎ গাড়ির ওজনের সমান জোরে সামনে ঠেলা। এ কারণেই টায়ারনির্ভর সবচেয়ে দ্রুত গাড়িগুলো বছরের পর বছর ০–৬০ মাইলে ১.৭ থেকে ২ সেকেন্ডের আশপাশে আটকে আছে।
এবার রোডস্টারের সময়গুলো দেখুন। ০–৬০ মাইল গতি ওই সময়ে তুলতে হলে গড়ে পারফরম্যান্স রূপের লাগে ১.৭১ জি, থ্রাস্ট রূপের ৩.০৪ জি, মঞ্চের ০.৮১ সেকেন্ডের দৌড়ে ৩.৩৮ জি, আর রকেট রূপের ৪.৬৪ জি। অর্থাৎ সবচেয়ে সাধারণ রূপটিও টায়ারের সীমা ছাড়িয়ে যায়। তাহলে বাড়তি জোর আসে কোথা থেকে?
প্রথম উত্তর ফ্যান। রেসিং গাড়ির ডানা গাড়িকে রাস্তায় চেপে ধরে বাতাসের গতি দিয়ে। কিন্তু গাড়ি থেমে থাকলে ডানা কিছুই করতে পারে না। টেসলার ফ্যান কাজ করে অন্যভাবে। গাড়ির তলদেশ ঘেরা থাকে। ফ্যান সেই ঘেরা জায়গা থেকে বাতাস টেনে বের করে দেয়, ফলে নিচে বাতাসের চাপ কমে যায়। ওপরের স্বাভাবিক বাতাস তখন বেশি জোরে গাড়িটিকে নিচের দিকে ঠেলে। রবারের চোষক যেভাবে মসৃণ দেয়ালে সেঁটে থাকে, ব্যাপারটা অনেকটা সে রকম। এখানে গতির কোনো ভূমিকা নেই।
ইলন মাস্ক বলেছেন, এই ব্যবস্থা দুই জি পর্যন্ত টানতে পারে। গাড়ি যখন উল্টো হয়ে ঝুলছিল, পর্দায় দেখা গেছে ৪,৭০০ কেজি বল।
মজার বিষয় হলো, এর জন্য খুব বেশি শূন্যতা লাগে না। ঘেরা এলাকা সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার বর্গমিটার ধরলে চাপ কমাতে হয় মাত্র ১০ থেকে ১৩ কিলোপাস্কাল, অর্থাৎ বাতাসের স্বাভাবিক চাপের প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ। এটি অনুমান।
কঠিন কাজটি অন্য জায়গায়। ঘেরের নিচের প্রান্ত আর রাস্তার মাঝের প্রতিটি ফাঁক দিয়ে বাইরের বাতাস ঢুকতে চায়, আর ফ্যানকে সেই বাতাস ততটাই দ্রুত বের করে দিতে হয়। বিশ্লেষণের হিসাবে গড় ফাঁক তিন মিলিমিটার হলে ফ্যানের ক্ষমতা লাগে প্রায় ৬২ কিলোওয়াট, আর ১০ মিলিমিটার হলে প্রায় ২০৮ কিলোওয়াট। প্রতি মিলিমিটার ফাঁকের দাম প্রায় ২০ কিলোওয়াট। মসৃণ র্যাম্পে এটা সামলানো যায়। কিন্তু ভাঙাচোরা সড়কে ঘেরকে রাস্তার কয়েক মিলিমিটারের মধ্যে রাখাই আসল প্রকৌশল-সমস্যা।
ধারণাটি অবশ্য নতুন নয়। ১৯৭০ সালের চ্যাপারাল ২জে আর ১৯৭৮ সালের ব্র্যাবহ্যাম বিটি৪৬বি ফ্যান দিয়ে গ্রিপ বাড়িয়েছিল। দুটিই পরে রেসের মাঠে নিষিদ্ধ হয়। আর ম্যাকমার্ট্রি স্পেয়ারলিং ২০২৫ সালের এপ্রিলে একটি ঘূর্ণায়মান র্যাম্পে উল্টো হয়ে চলেছে।
গাড়ির ওজন টেসলা বলেনি। তবে ৪,৭০০ কেজি যদি মাস্কের বলা দুই জি-র ফল হয়, তাহলে ওজন দাঁড়ায় ৪,৭০০ ভাগ ২, অর্থাৎ প্রায় ২,৩৫০ কেজি। এটি অনুমান, আর পর্দার সংখ্যাটি সর্বোচ্চ মান নাও হতে পারে।
কিন্তু ফ্যান গ্রিপ বাড়ালেও গ্রিপের সীমা ভাঙতে পারে না। সীমা ভাঙতে হলে এমন কিছুকে ঠেলতে হবে, যা রাস্তা নয়। সেই জিনিস বাতাস। এখানেই আসে নিউটনের তৃতীয় সূত্র: প্রতিটি ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। টেসলা বলেছে, রোডস্টারের থ্রাস্টার টায়ারের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি বল তৈরি করে।
থ্রাস্টারগুলো কোল্ড গ্যাস থ্রাস্টার, মানে সবচেয়ে সরল ধরনের রকেট। এতে কিছু পোড়ে না। ফুলিয়ে রাখা বেলুনের মুখ ছেড়ে দিলে বেলুন যেমন উল্টো দিকে ছোটে, এখানেও ঘটনা তা-ই, শুধু অনেক অনেক জোরে। উচ্চচাপে জমানো বাতাস ভালভ পেরিয়ে নজলে ঢোকে। নজল প্রথমে সরু হয়ে গলায় পৌঁছায়, তারপর আবার চওড়া হয়। গলায় বাতাসের গতি শব্দের গতির সমান হয়, চওড়া অংশে আরও বেড়ে সে সুপারসনিক বেগে বেরিয়ে যায়। বাতাস একদিকে ছুটলে গাড়ি অন্যদিকে ধাক্কা খায়।
ধাক্কার পরিমাণ নির্ভর করে প্রতি সেকেন্ডে কত ভরের বাতাস বেরোচ্ছে আর তা কত বেগে বেরোচ্ছে, তার ওপর। এর সঙ্গে যুক্ত হয় একটি চাপজনিত অংশ, যদি বেরোনোর সময় বাতাসের চাপ বাইরের চেয়ে বেশি থাকে। এই অংশটির জন্যই টেসলা বলেছে, বায়ুমণ্ডলে থ্রাস্টার চালানো মহাশূন্যের চেয়ে কঠিন। মহাশূন্যে বাইরে কোনো চাপ নেই, কিন্তু ভূপৃষ্ঠে বাইরের বাতাস নজলের মুখে উল্টো চাপ দেয়।
আদর্শ হিসাবে ৫,৫০০ পিএসআই (প্রায় ৩৮০ বার) চাপের বাতাস সমুদ্রপৃষ্ঠের চাপ পর্যন্ত পুরো প্রসারিত হলে বেরোনোর বেগ দাঁড়ায় প্রায় ৬৯৩ মিটার প্রতি সেকেন্ড। ৮০ কিলোনিউটন পেতে প্রতি সেকেন্ডে লাগে প্রায় ১১৫ কেজি বাতাস।
কিন্তু বাস্তবে এই আদর্শ মান মেলে না। ৩৮০ বার থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের চাপ পর্যন্ত বাতাস পুরো প্রসারিত হলে তার তাপমাত্রা নেমে যেত প্রায় ৫৪ কেলভিনে, মানে মাইনাস ২১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। অথচ নাইট্রোজেন তরল হয়ে যায় ৭৭ কেলভিনে, আর অক্সিজেন ৯০ কেলভিনে। তাই নজলের ভেতরে পুরো প্রসারণ ঘটতে দিলে বাতাস তরল হয়ে বরফ জমাত। বাস্তবে বাতাস কিছুটা বেশি চাপ নিয়েই নজল ছাড়ে, আর বাকি প্রসারণ ঘটে বাইরে, একের পর এক শক-তরঙ্গের মধ্য দিয়ে। টেসলা প্লুমে যে ‘মাখ ডায়মন্ড’, অর্থাৎ হীরার মতো উজ্জ্বল দাগ দেখিয়েছে, সেগুলো ওই শক-তরঙ্গেরই দৃশ্যমান রূপ। বাস্তব-গ্যাসের হিসাবে সমুদ্রপৃষ্ঠে নির্দিষ্ট ইমপালস, অর্থাৎ থ্রাস্টারের দক্ষতার মাপ, ৫৪ থেকে ৬০ সেকেন্ড। আদর্শ হিসাবে তা ৭০.৭ সেকেন্ড।
এখন একটি প্রশ্ন: ট্যাংকে আসলেই কত বাতাস আছে? গ্যাসের সূত্র দিয়ে টেসলার সংখ্যাটি যাচাই করা যায়। ৬০০ লিটারের ট্যাংকে ৩৭৯ বার চাপ ও ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আদর্শ গ্যাসের সূত্রে বাতাসের ভর পাওয়া যায় ২৭০ কেজি। কিন্তু এত চাপে বাস্তব বাতাস প্রায় ১৯ শতাংশ কম ঘন হয়ে যায়। তাই বাস্তব হিসাবে ভর প্রায় ২২৭ কেজি। মোরাভি বলেছেন প্রায় ২৫০ কেজি। এই সংখ্যা দুই হিসাবের মাঝামাঝি, অর্থাৎ টেসলার কথা সংগতিপূর্ণ।
কিন্তু এখানেই ভরের নিত্যতা কঠিন সীমা টেনে দেয়। ৮০ কিলোনিউটনে প্রতি সেকেন্ডে ১১৫ থেকে ১৫১ কেজি বাতাস বেরিয়ে যায়। ফলে পূর্ণ জোরে ট্যাংক টেকে মাত্র দেড় থেকে দুই সেকেন্ড। বাস্তবে আরও কম, কারণ ট্যাংক খালি হতে থাকলে থ্রাস্টও কমতে থাকে। বাতাস বেরোলে ভেতরে যা থাকে, তা প্রসারিত হয়ে ঠান্ডা হয়, আর চাপ পড়ে ভরের চেয়ে দ্রুত। বাইরে থেকে তাপ ঢোকে না ধরলে, অর্ধেক বাতাস বাকি থাকতে চাপ নামে ১৪৪ বারে, তাপমাত্রা মাইনাস ৫১ ডিগ্রিতে, আর থ্রাস্ট নেমে আসে পূর্ণ মানের ৩৮ শতাংশে। বাতাস এক-চতুর্থাংশ বাকি থাকলে থ্রাস্ট মাত্র ১৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে থ্রাস্ট প্রায় আধা সেকেন্ডেই অর্ধেক হয়ে যায়।
বাস্তবে কার্বন-তন্তুর দেয়াল ভেতরের গ্যাসকে কিছুটা গরম রাখে, তাই ফল এই হিসাব ও তাপমাত্রা স্থির থাকার হিসাবের মাঝামাঝি হবে। তবু ভালভ আর নলকে হিমাঙ্কের অনেক নিচের ঠান্ডায় কাজ করতে হয়, আর বাতাস হতে হয় একেবারে শুকনো, নইলে ভেতরে বরফ জমবে।
এবার আসি মাটি ছাড়ার কথায়, যেখানে কাজ করে নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র। মাটি ছাড়তে হলে ওপরে ঠেলার বল গাড়ির ওজনের চেয়ে বেশি হতে হয়। ২,৩৫০ কেজির গাড়ির ওজন প্রায় ২৩ কিলোনিউটন, যা ৮০ কিলোনিউটনের প্রায় ২৯ শতাংশ। তাই ওঠা কঠিন নয়। কঠিন হলো ভাসিয়ে রাখা, কারণ তাতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৩ কেজি বাতাস খরচ হয়। থ্রাস্ট ওজনের নিচে নামার আগে ব্যবহারযোগ্য বাতাস ১৩৪ থেকে ১৬১ কেজি। তাই এক ট্যাংকে ভাসা যায় সর্বোচ্চ চার-পাঁচ সেকেন্ড। অর্থাৎ এই গাড়ির ওড়া একটি লাফ, কোনো যাত্রা নয়। এটিও অনুমান।
০.৫৯ সেকেন্ডের হিসাবটাও মজার। গাড়ি চলে পেছনের চাকায়, তাই শুধু পেছনের টায়ারের গ্রিপই হিসাবে ধরতে হয়। ২,৩৫০ কেজি ধরলে পেছনের টায়ার আর থ্রাস্ট মিলে পাওয়া যায় প্রায় ৪.২ থেকে ৪.৪ জি। ড্র্যাগ রেসের মতো এক ফুট রোলআউট ধরলে লাগে ৩.৮ জি, যা এতে পূরণ হয়। কিন্তু একেবারে স্থির অবস্থা থেকে লাগে ৪.৬৪ জি, যা হয় না।
এই ঘাটতি মিটতে পারে দুভাবে। প্রথমত, শুরুর মুহূর্তে ফ্যান পেছনের টায়ারকে রাস্তায় চেপে ধরলে। গতি শূন্য থাকলেও ফ্যান কাজ করে, ডানা করে না। দ্বিতীয়ত, থ্রাস্ট ৮০ কিলোনিউটনের বেশি হলে। এই হিসাবে টেসলার ‘চার-পাঁচ গুণ’ দাবিও মেলে, কারণ পেছনের টায়ারের বলের তুলনায় ৮০ কিলোনিউটন প্রায় ৩.৯ থেকে ৪.৮ গুণ। মঞ্চের ০.৮১ সেকেন্ডের দৌড়ে লাগা ৩.৩৮ জি সহজেই এর মধ্যে পড়ে।
শূন্যে ব্যারেল রোলের পেছনে কাজ করেছে ঘূর্ণনের সূত্র: টর্ক হলো জড়তা-ভ্রামক আর কৌণিক ত্বরণের গুণফল। সহজ কথায়, দরজা ঠেললে যেমন কবজার চারদিকে ঘোরে, এখানেও এক পাশের থ্রাস্টার চালালে গাড়ি নিজের ভরকেন্দ্রের চারদিকে ঘুরতে শুরু করে। উল্টো পাশের থ্রাস্টার চালালে ঘোরা থামে। গাড়িকে দুই মিটার চওড়া ও ১.১ মিটার উঁচু নিরেট বাক্স ধরলে দুই সেকেন্ডে পূর্ণ এক পাক ঘুরতে পাশের থ্রাস্ট লাগে প্রায় ৭ কিলোনিউটন। দেড় সেকেন্ডে লাগে প্রায় ১৩ কিলোনিউটন, আর এক সেকেন্ডে প্রায় ২৮ কিলোনিউটন। এগুলোও অনুমান।
বাস্তবে এই রোল কয়েকটি ক্ষুদ্র বিস্ফোরণের নিয়ন্ত্রিত ক্রম। এক পাশে শুরু হয়, অন্য পাশে শেষ হয়, আর বৈদ্যুতিক ভালভ সেকেন্ডে বহুবার তা শুধরে নেয়। মাস্ক জানিয়েছেন, প্রদর্শনীর গাড়ি উড়েছে কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণে, চালকের হাতে নয়।
এবার শক্তির হিসাব, যা দেখায় এই পদ্ধতি বেজায় অপচয়ী, তবু কাজের। বেশি গতিতে জেট দিয়ে গাড়ি ঠেলা কম দক্ষ উপায়। ৬০ মাইল গতিতে এর চালনা-দক্ষতা মাত্র সাড়ে সাত শতাংশের মতো। ৮০ কিলোনিউটনে বেরোনো বাতাস বহন করে প্রায় ২৮ মেগাওয়াট শক্তি, অথচ ২,৩৫০ কেজির গাড়িকে ৪.৬৪ জি-তে ৬০ মাইল গতিতে তুলতে লাগে প্রায় ২.৯ মেগাওয়াট। কিন্তু থ্রাস্টারের কাজ তো দক্ষভাবে গতি তৈরি করা নয়। টায়ার যে বল দিতে পারে না, সেই বল এক সেকেন্ডের মতো সময়ের জন্য এনে দেওয়াই তাদের কাজ।
তাহলে একে ‘উড়ন্ত গাড়ি’ বলা যায় কি? এখনই নয়। আর এই সূত্রগুলোই সেই সীমা টেনে দেয়। পূর্ণ জোরে ট্যাংকের বাতাস দেড় থেকে দুই সেকেন্ডে ফুরিয়ে যায়, আর ভাসা যায় সর্বোচ্চ চার-পাঁচ সেকেন্ড।
বাতাস আবার ভরার পদ্ধতি বা সময় টেসলা জানায়নি। তত্ত্বে ৬০০ লিটার ৫,৫০০ পিএসআইয়ে ভরতে লাগে প্রায় ৩৭ কিলোওয়াট-ঘণ্টা। বাস্তব কম্প্রেসরে লাগবে ৫৮ থেকে ৭৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা, আর ছোট কম্প্রেসর হলে কয়েক ঘণ্টা।
নিরাপত্তার প্রশ্নও বড়। ট্যাংকে জমা কার্যকর শক্তি প্রায় ১১২ মেগাজুল, যা প্রায় ২৭ কেজি টিএনটির সমান। তাই সড়কে চালাতে হলে দুর্ঘটনা, আগুন ও ক্লান্তির কড়া ছাড়পত্র লাগবে। রকেট রূপকে টেসলা নিজেই ‘সড়কে চলার জন্য অনুমোদিত নয়’ বলে চিহ্নিত করেছে। উৎপাদন ২০২৮ সালে, অথচ ২০১৭ সালে প্রথম ঘোষণায় বলা হয়েছিল ২০২০।
শেষ পর্যন্ত রোডস্টার পদার্থবিজ্ঞান ভাঙেনি। সে ফ্যান দিয়ে ঘর্ষণ সূত্রের সীমা সরিয়েছে, তারপর সেই সীমার বাইরে গিয়ে নিউটনের তৃতীয় সূত্রকে কাজে লাগিয়েছে। আর পুরো ব্যাপারটাই চলেছে গ্যাসের ধর্ম আর ভরের কঠোর হিসাবের মধ্যে।
১৯৫০-এর দশকে মানুষ যে উড়ন্ত গাড়ির স্বপ্ন দেখেছিল, তা এখনো আসেনি। যা এসেছে, তা হলো সূত্রের জোরে অল্প কয়েক সেকেন্ডের জন্য সীমা ছাড়ানো একটি গাড়ি। স্বপ্নের সেই গাড়ি থেকে এটি এখনো অনেক দূর, তবে দূরত্বটা আগের চেয়ে একটু কমেছে।














