
ইন্টারনেটের রাজ্যে যদি কোনো মুকুট থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে গুগল ক্রোমের মাথায়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ব্রাউজারটি এমনভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে যে, প্রতিদ্বন্দ্বীরা যেন কেবল তার ছায়াতেই বাঁচে। কিন্তু এখন মঞ্চে নতুন এক প্রতিযোগী—‘অ্যাটলাস’, যার পেছনে রয়েছে চ্যাটজিপিটির জনক, ওপেনএআই।
প্রশ্নটা তাই সরল—অ্যাটলাস কি পারবে ক্রোমকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে? নাকি এটি কেবল এআই যুগের আরেকটি উজ্জ্বল কিন্তু ক্ষণস্থায়ী আতশবাজি?
🧠 চ্যাটের ছোঁয়ায় নতুন ব্রাউজার
অ্যাটলাস কোনো সাধারণ ব্রাউজার নয়—এটি এক কথায় ‘চ্যাটজিপিটির ডিজিটাল এক্সটেনশন’। ওপেনএআইয়ের নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের ভাষায়, এটি এমন এক ব্রাউজার যেখানে অ্যাড্রেস বার নেই, বরং কেন্দ্রে আছে আলাপ।
আপনি টাইপ করবেন না, বলবেন—আর চ্যাটজিপিটি আপনার হয়ে খুঁজে আনবে, তুলনা করবে, এমনকি সারসংক্ষেপও লিখে দেবে। রেসিপি জানতে চাইলেন? অ্যাটলাস শুধু রেসিপি দেয় না—ইন্সটাকার্টের মাধ্যমে উপকরণ অর্ডারও করে দেয়! ভ্রমণ করবেন ভাবছেন? বুকিং ডটকমে আপনার পছন্দ মতো রুম বুক করেও ফেলতে পারে এআই সহকারীটি। অর্থাৎ, আপনি কীবোর্ড ধরবেন না, বরং আপনার ব্রাউজারই ধরবে আপনার হয়ে কাজের ভার।
💬 এআইয়ের হাত ধরে ‘ডিজিটাল সঙ্গী’র উত্থান
ওপেনএআই বলছে, অ্যাটলাসে যুক্ত থাকবে ‘এজেন্ট মোড’ নামের এক বুদ্ধিমান সহকারী, যিনি ব্যবহারকারীর নির্দেশ বুঝে নিজে থেকেই তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনে অনলাইন লেনদেনও করতে পারবে। শুনতে যতটা রোমাঞ্চকর, বাস্তবে তা কিছুটা আতঙ্কও জাগায়। কারণ এই মোড আপনার হয়ে ‘কর্ম’ সম্পন্ন করতে পারে—অর্থাৎ একপ্রকার ডিজিটাল প্রতিনিধি।

যদিও ওপেনএআই আশ্বস্ত করছে, ব্রাউজারটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা সংবেদনশীল ওয়েবসাইটে ঢুকবে না, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—একটি এআইকে কতটা বিশ্বাস করা যায়, যখন সে আপনার হয়ে কাজও করছে, সিদ্ধান্তও নিচ্ছে?
⚠️ গোপনীয়তার সুরে সতর্ক ঘণ্টা
কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক এলেনা সিমপার্লের মন্তব্যে এক ধরনের বাস্তব আশঙ্কার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তিনি বলেন, “প্রত্যেক চ্যাটবটেরই একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা আছে—এরা নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য সূত্রের মধ্যে তফাৎ করতে জানে না।”
তাঁর শঙ্কা এখানেই শেষ নয়। “আমরা অনেক ব্যক্তিগত তথ্য দিচ্ছি, যা আমাদের ব্রাউজিং ইতিহাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে—আর তা এমন এক প্রতিষ্ঠানের হাতে যাচ্ছে, যার গোপনীয়তা রক্ষার কোনো প্রমাণিত রেকর্ড এখনো নেই।”
অ্যাটলাসে আছে একটি ‘ব্রাউজার মেমোরি’ ফিচার—যা আপনার সার্চ ইতিহাস মনে রাখে এবং ভবিষ্যতে প্রম্পট হিসেবে ব্যবহার করে। ওপেনএআই দাবি করছে, এটি ঐচ্ছিক। কিন্তু প্রযুক্তি ইতিহাস বলে, যা ঐচ্ছিক, তা-ই একদিন হয়ে যায় অভ্যাস।
⚔️ গুগল বনাম ওপেনএআই: দুই দানবের সংঘর্ষ
এখন প্রশ্ন—এই নতুন প্রতিযোগিতা গুগলের জন্য কতটা বাস্তব?
গবেষণা প্রতিষ্ঠান দাতোস জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ডেস্কটপ সার্চের প্রায় ৬ শতাংশই হচ্ছে চ্যাটজিপিটির মতো ভাষাভিত্তিক মডেল দিয়ে—যা এক বছর আগের দ্বিগুণ। অর্থাৎ, মানুষ ধীরে ধীরে ‘সার্চ রেজাল্ট’ নয়, ‘আলাপের উত্তর’ চাচ্ছে।
তবুও, গুগল বসে নেই। তারা ইতিমধ্যে জেমিনি এআই-কে ক্রোমের সঙ্গে একীভূত করেছে। অর্থাৎ, গুগলও জানে—ভবিষ্যৎ শুধুই ব্রাউজিং নয়, ইন্টারঅ্যাকশন।
বিশ্লেষক প্যাট মুরহেড তাই মন্তব্য করেছেন, “অ্যাটলাস হয়তো প্রযুক্তিপ্রেমীদের আকৃষ্ট করবে, কিন্তু সাধারণ ব্যবহারকারী এখনো ক্রোমের মতো পরিচিত ব্রাউজারে নতুন ফিচারের অপেক্ষায়।”
💰 ডেটা, বিজ্ঞাপন আর আধিপত্যের খেলা
অনেকে বলছেন, অ্যাটলাসের আসল উদ্দেশ্য সার্চ নয়—বিজ্ঞাপন বাজার দখল। কারণ ব্রাউজারের মধ্যেই যদি এআই আলাপ চলে, তবে গুগলের সার্চ বিজ্ঞাপন আর কতটা দেখা হবে?
ডি.এ. ডেভিডসনের বিশ্লেষক গিল লুরিয়ার মতে, “যদি ওপেনএআই অ্যাটলাসের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন চালু করে, তবে গুগলের বিজ্ঞাপন বাজারের বড় অংশ ঝুঁকির মুখে পড়বে।”
অর্থাৎ, সার্চ ইঞ্জিনের যুদ্ধ আসলে তথ্যের নয়—তথ্যের পেছনের টাকার যুদ্ধ।
🧭 শেষ প্রশ্ন: আমরা কোথায় যাচ্ছি?
অ্যাটলাস এখন ম্যাক ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত। শিগগিরই আসবে উইন্ডোজ ও অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণও। তবে প্রশ্নটা প্রযুক্তির নয়, দর্শনের—আমরা কি এমন এক যুগে ঢুকছি, যেখানে ব্রাউজার আমাদের হয়ে চিন্তা করবে? যদি তাই হয়, তবে হয়তো একদিন আমরা ব্রাউজার খুলব না, বরং ব্রাউজারই খুলবে আমাদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত—যেখানে সার্চ নয়, সংলাপই হবে তথ্যের নতুন দরজা।
লেখা : বিবিসি অবলম্বনে










































