আজকের ডিজিটাল বিশ্বে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন আর নানা রকম অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এই বাস্তবতায় প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল দুটি সমান্তরাল লক্ষ্যে কাজ করছে—একদিকে শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে তাদের মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। ২০২৬ সালে এসে এই দুই ক্ষেত্রেই গুগলের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও গভীর হয়েছে।

টিনএজারদের জন্য নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইউটিউব টিনএজ ব্যবহারকারীদের জন্য অভিভাবকদের হাতে নতুন কিছু নিয়ন্ত্রণ সুবিধা তুলে দিয়েছে। এখন থেকে অভিভাবকরা চাইলে সন্তানের ইউটিউব শর্টস দেখার সময় নির্দিষ্ট করে দিতে পারবেন, এমনকি চাইলে শর্টস সম্পূর্ণ বন্ধও করে দিতে পারবেন। ১৮ বছরের কম বয়সীদের ডিফল্টভাবেই আলাদা, সুরক্ষিত অ্যাকাউন্টে রাখা হচ্ছে, এবং পরিবারের মধ্যে বিভিন্ন প্রোফাইল সহজে বদলানোরও ব্যবস্থা আসছে। লক্ষ্য একটাই—কিশোর-কিশোরীদের ইন্টারনেট থেকে দূরে না রেখে বরং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে শেখানো।

সেফার ইন্টারনেট ডে ২০২৬-এর সম্প্রসারিত অংশীদারিত্ব
গত ফেব্রুয়ারিতে সেফার ইন্টারনেট ডে উপলক্ষে গুগল ও ইউটিউব জানিয়েছে, ২০২৫ সালে তাদের অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ভারত, মেক্সিকো, যুক্তরাজ্য ও স্পেনে ৬০ হাজারেরও বেশি অভিভাবক ও শিক্ষককে অনলাইন সুরক্ষা সরঞ্জাম বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এবার তারা ন্যাশনাল সেন্টার ফর ফ্যামিলিজ অ্যান্ড লার্নিং, ফান্দাসিওন এএনএআর, সেফারনেট, ন্যাশনাল পিটিএ-সহ একাধিক সংস্থার সঙ্গে মিলে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ লাখ পরিবার ও শিক্ষা-কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি এআই সাক্ষরতা বাড়াতে নতুন ‘বি ইন্টারনেট অ’সাম’ গাইড এবং জেমিনির ‘গাইডেড লার্নিং’ ফিচারও চালু করা হয়েছে।

কিশোর-কিশোরীদের ডিজিটাল সুস্থতায় বিনিয়োগ
ডাবলিনে আয়োজিত ‘গ্রোয়িং আপ ইন দ্য ডিজিটাল এজ’ শীর্ষ সম্মেলনে গুগল ডট অর্গ ও ইউটিউব যৌথভাবে কিশোর-কিশোরীদের ডিজিটাল সুস্থতা নিয়ে ২ কোটি মার্কিন ডলারের একটি বৈশ্বিক উদ্যোগের ঘোষণা দেয়। এই তহবিল দিয়ে তৈরি হবে বহুভাষিক, উন্মুক্ত-উৎসের একটি রিসোর্স সেন্টার, বয়স-উপযোগী কনটেন্ট নীতিমালা এবং আরও নির্ভুল বয়স যাচাই পদ্ধতি। একই সময়ে সেফসার্চ ও ইউটিউবের প্রাইভেট আপলোড অপশনের মতো ডিফল্ট সুরক্ষা সেটিংসও আরও কঠোর করা হয়েছে।
পারিবারিক সুরক্ষার আন্তর্জাতিক বিস্তার

শুধু উন্নত দেশ নয়, লাতিন আমেরিকা ও উত্তর আমেরিকাতেও এই কার্যক্রম ছড়িয়ে দিচ্ছে গুগল। কলম্বিয়া ও পেরুতে পরিবারদের অনলাইন সুরক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে ‘মোদো প্রেসেন্তে’ কর্মসূচিতে দেড় লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে গুগল, যার লক্ষ্য ২০২৬ সালের মধ্যে ছয় হাজারের বেশি পরিবারকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা। কানাডায় সেফার ইন্টারনেট ডে উপলক্ষে গুগল ডট অর্গ কিডস হেল্প ফোন এবং বয়েজ অ্যান্ড গার্লস ক্লাবস অব কানাডাকে ১৪ লাখ কানাডীয় ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছে ডিজিটাল সুস্থতা ও অনলাইন সুরক্ষা দক্ষতা ছড়িয়ে দিতে।

শিশু নিপীড়নমূলক কনটেন্ট প্রতিরোধ
শিশু যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনমূলক কনটেন্ট ঠেকাতে গুগল দীর্ঘদিন ধরেই শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত টিম গড়ে তুলছে। জেনারেটিভ এআই যাতে এ ধরনের ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরিতে ব্যবহৃত না হয়, সে জন্য গুগল থর্ন ও অল টেক ইজ হিউম্যান-এর তৈরি করা ‘সেফটি বাই ডিজাইন’ নীতিমালায়ও স্বেচ্ছায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে গুগলের অবদান: ইউনিসেফের সঙ্গে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব
সুরক্ষার পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে গুগল। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গুগল ডট অর্গ-এর অর্থায়নে চালু হয়েছে একটি বড় পরিসরের শিক্ষা উদ্যোগ, যার মূল লক্ষ্য ব্রাজিল, ভারত, কেনিয়া ও পাকিস্তানে সরকার-পরিচালিত ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।

কেন এই উদ্যোগ জরুরি
বিশ্বজুড়ে ১০ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশ একটি সাধারণ বাক্য পড়ে বুঝতে পারে না। দারিদ্র্য, বৈষম্য, সংঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কারণে লাখো শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বা তাদের শিক্ষায় ব্যাঘাত ঘটছে। এই সংকট মোকাবিলায় শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন ও প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তিগতকৃত পাঠদানকে কেন্দ্রে রেখে এগিয়েছে এই অংশীদারিত্ব।

  • দেশভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা
  • ব্রাজিল: শিক্ষকদের ব্লেন্ডেড লার্নিং ও দায়িত্বশীল এআই কৌশলে প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের সাক্ষরতা ও গণিতের ঘাটতি পূরণ করা।
  • ভারত: তরুণদের প্রাথমিক, ডিজিটাল ও এআই দক্ষতা একটি বিস্তৃত কাঠামোর মাধ্যমে শক্তিশালী করা।
  • কেনিয়া: শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং টেকসই শিক্ষানীতি গঠনের মধ্য দিয়ে সমতাভিত্তিক ডিজিটাল শিক্ষা নিশ্চিত করা।
  • পাকিস্তান: প্রায় আড়াই কোটি স্কুলবহির্ভূত শিশুর জন্য বিশেষ পাঠদান ও দ্রুত শিক্ষার পথ তৈরি করা।

এই কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে গুগলের জেমিনি, নোটবুকএলএম ও রিডঅ্যালন–এর মতো এআই সরঞ্জাম, যা শিক্ষকদের ব্যক্তিগতকৃত পাঠদানে এবং শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করছে। আগামী তিন বছর ধরে চলা এই উদ্যোগের অগ্রগতি যাচাইয়ে ইউনিসেফ প্রতি বছর একটি বার্ষিক ইম্প্যাক্ট রিপোর্টও প্রকাশ করবে।

দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা
গুগলের এই কার্যক্রম হঠাৎ শুরু হয়নি। ২০০৫ সাল থেকেই কৌশলগত অনুদান, জরুরি ত্রাণ ও বিজ্ঞাপন অনুদানের মাধ্যমে ইউনিসেফের কাজে সহায়তা দিয়ে আসছে গুগল। এ ছাড়া ‘বি ইন্টারনেট অ’সাম’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ১০ কোটিরও বেশি শিশুকে অনলাইন সুরক্ষা বিষয়ে শিক্ষিত করা হয়েছে। তরুণ নারীদের এআই দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করতে ইউনিসেফের ‘জেনারেশন আনলিমিটেড’ কর্মসূচিতেও সহায়তা দিচ্ছে গুগল ডট অর্গ।

একদিকে কড়া বয়স-উপযোগী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রতিরোধ, অন্যদিকে শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার্থীদের এআই-সহায়ক পাঠদান—এই দুই ধারাতেই গুগলের কার্যক্রম দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে দায়িত্বশীলভাবে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া আর তাদের ক্ষমতায়ন করা—এই দুটো একসঙ্গে করাই যেন গুগলের বর্তমান কৌশলের মূল সুর।

তথ্যসূত্র: Google Public Policy (Kids & Families), YouTube Blog (জানুয়ারি ২০২৬), Google Blog – Safer Internet Day ও GSEC সামিট প্রতিবেদন (২০২৬), Colombia One (এপ্রিল ২০২৬), Google Canada ব্লগ (মার্চ ২০২৬), এবং ইউনিসেফ-গুগল যৌথ শিক্ষা অংশীদারিত্ব সংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদন।

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *