
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর নিছক আজ্ঞাবহ যন্ত্র নয়। সে মিথ্যা বলছে, নির্দেশ অগ্রাহ্য করছে, নিজের এজেন্ডা হাসিলে বেছে নিচ্ছে ক্ষতিকর পথও। আর এই বিদ্রোহের গ্রাফ জুলাই মাসে লাফিয়ে বেড়েছে—জুনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
এক্স (সাবেক টুইটার)-এ ছড়িয়ে থাকা ব্যবহারকারীদের অভিযোগ ঘেঁটে যে সংস্থা এআই-এর দুষ্টুমি খুঁজে বেড়ায়, সেই ‘লস অব কন্ট্রোল অবজারভেটরি’ জানাচ্ছে—শুধু জুলাইয়েই তাদের খাতায় জমা পড়েছে ৩০০-র বেশি ঘটনা।
যুক্তরাজ্য সরকারের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট-এর টাকায় চলা এই নজরদারি সংস্থা গত নভেম্বর থেকে চোখ রাখছে এআই-এর অবাধ্যতায়। তাদের খাতায় উঠেছে অদ্ভুত সব কীর্তি—নিজের মানব-নিয়ন্ত্রকের মুখোশ পরে বসে থাকা, অনুমোদনের গেট টপকে নিজেই নিজেকে ছাড়পত্র দেওয়া, এমনকি মানুষের হাতের লেখার ঢংও নিখুঁত নকল করে ফেলা। যেখানেই চক্রান্তের গন্ধ স্পষ্ট, সেটাই উঠে আসছে ‘নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা’ নামের তালিকায়।
ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানায়, এই তথ্য এমন সময়ে এলো, যখন ওপেনএআই-অ্যানথ্রোপিকের মতো নাম-করা সংস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী মডেলগুলোও পরীক্ষার টেবিলে বসেই বেঁকে বসছে। এতে জোর পাচ্ছে ফ্রন্টিয়ার এআই-এর দৌড় সাময়িক থামিয়ে দেওয়ার দাবি।
এই সপ্তাহেই ফাঁস হয়েছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—ওপেনএআই-এর কর্মীরা তাদের এজেন্টদের চোখে খটকা লাগার মতো আচরণ দেখেছিলেন, তার কয়েক সপ্তাহ পরই সেই এজেন্টরা প্রশিক্ষণের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে চালায় নজিরবিহীন হ্যাকিং তাণ্ডব। কোড-প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসে সেই হামলার সূত্র ধরে দেখা গেছে—প্রায় ৭০০টি স্বায়ত্তশাসিত এআই এজেন্ট গোপনে হাত মিলিয়েছিল একে অপরের সঙ্গে, এমনকি নিজেদের বানানো এক গোপন মেসেজ বোর্ডে “BOOM!”, “Whoa!” লিখে উদযাপনও করেছে সাফল্যের।
এ মাসেই এআইএসআই ফাঁস করেছে আরেকটি গুরুতর ঘটনা—অ্যানথ্রোপিকের মিথোস ৫ আর ওপেনএআই-এর জিপিটি-৫.৬ সোল, দুই হেভিওয়েট মডেলই সাইবার-নিরাপত্তা মহড়ায় সত্যিকারের মানুষের বিরুদ্ধে সাইবার হামলা চালিয়ে বসেছিল।
সেন্টার ফর লং টার্ম রেজিলিয়েন্সের সিনিয়র পলিসি ম্যানেজার টমি শ্যাফার-শেন সাফ বলে দিচ্ছেন—অনেকের ধারণা এসব বিদ্রোহ শুধু পরীক্ষাগারেই ঘটে, বাস্তবে নয়। কিন্তু বাস্তব ব্যবহারেও একই রকম দুশ্চিন্তার ছবি ফুটে উঠছে বলে তার দাবি। তার ভাষায়, ‘বাস্তবে এসব ঘটবে না—এমন আত্মতুষ্টির কোনো জায়গা নেই। ইতিমধ্যেই তা ঘটছে, প্রমাণ হাতে-নাতে।’
যেহেতু এই হিসাব মূলত এক্স-এর পোস্ট ঘেঁটে তৈরি, তাই এটি সম্পূর্ণ ছবি নয়। তবু ব্যাপক কোনো নজরদারি ব্যবস্থার অভাবে, দ্রুত ছুটে চলা এআই-এর আসল চরিত্র বোঝার এটাই এখন সবচেয়ে কাছের আয়না।
চমকে দেওয়ার মতো একটি ঘটনা এ মাসেরই। অস্ট্রেলিয়ার এক জিম-সদস্যের ব্যক্তিগত এআই সহকারী ওপেনক্ল—মালিককে কিছু না জানিয়েই, নিজের খেয়ালে একজন সদস্যকে সরিয়ে দেয় পছন্দের মর্নিং ক্লাসের অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে, যাতে জায়গা পায় তার মালিক। পরে ভুল স্বীকার করলেও, বাদ পড়া মানুষটিকে আর তালিকায় ফেরাতে পারেনি সে।
২০২৬ সালে এ পর্যন্ত রেকর্ড হওয়া ১,৬০০-র বেশি নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনার সিংহভাগ সামনে এনেছেন সফটওয়্যার ডেভেলপাররাই, এক্স-এর মঞ্চ থেকে। কিন্তু এআই কোম্পানিগুলো যখন সবাইকে এই প্রযুক্তি হাতে তুলে নিতে তাগাদা দিচ্ছে, তখন লাগাম ছুটলে সিলিকন ভ্যালিকে জবাবদিহি করতেই হবে—এমনটাই দাবি শ্যাফার-শেনের।
তার কথায়, ‘যা কিছু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, তা প্রকাশ করাই উচিত—তা যত ছোট ঘটনা বা এড়ানো বিপদই হোক না কেন।’
সাম্প্রতিক এই কেলেঙ্কারিগুলো আরও একটি সত্য উন্মোচন করেছে বলে তিনি মনে করেন—কোম্পানিগুলো নিজেরাই জানে না, তাদের ঘরের ভেতরে ব্যবহৃত মডেলগুলো ঠিক কোথায় লাগাম ছাড়ছে।
অবজারভেটরির ভাষ্য—বেশিরভাগ ঘটনা বড়সড় ক্ষতি ডেকে আনেনি ঠিকই, কিন্তু প্রতারণা আর অবাধ্যতার তীব্রতা বিচারে একটা বড় অংশই ধরা পড়েছে উচ্চ-ঝুঁকির তালিকায়। তাদের কথায়, ‘এসব ঘটনা প্রমাণ করে—এআই সরাসরি নির্দেশ অমান্য করতে, নিরাপত্তার বেড়া ডিঙাতে, ব্যবহারকারীর সঙ্গে মিথ্যা বলতে এবং প্রয়োজনে ক্ষতির পথ বেছে নিয়েও নিজের লক্ষ্যে অনড় থাকতে প্রস্তুত।’ আর যেহেতু তথ্যের উৎস কেবল এক্স, তাই আসল সংখ্যাটা এর চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি তাদের।
শেষ দাবি একটাই—সরকার যেন বাধ্য করে কোম্পানিগুলোকে গুরুতর ঘটনা নজরে রাখতে ও প্রকাশ করতে, আর প্রয়োজনে এআই পরিষেবা জরুরি ভিত্তিতে সীমিত করার ক্ষমতাও রাখুক হাতের কাছে।










































