
মুক্ত জানালা ডেস্ক
পৃথিবীতে মানুষ কীভাবে আসলো এটা নিয়ে সবার কৌতূহলের অন্ত নেই। তাবৎ বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিচ্ছেন এটা নিয়ে গবেষণা করতে করতে। বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার বিপরীতে প্রচলিত রয়েছে নানা ধর্মের নানা ব্যাখ্যা। কিন্তু কেউই সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি। আসলেই মানুষের সৃষ্টি কীভাবে? পৃথিবীতে প্রাণ কীভাবে এলো? প্রাণ ছাড়াও পৃথিবীতে দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান আরও যেসব বস্তু রয়েছে সেগুলোর সৃষ্টি কীভাবে?
কেউ বলেছেন পানিতে এককোষী জীব হতে প্রথমে প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে। এরপর বিবর্তনের মাধ্যমে আজকের মানুষে পরিণত হয়েছে। কারো মতে, মহাবিশ্বের নক্ষত্র বা তারকার মধ্যে প্রাণ ও অন্যান্য উপাদানের সৃষ্টি হয়েছে। এরপর সেই নক্ষত্রগুলো বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংসের ফলে তার উপাদারগুলো পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। আর এভাবে পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে। আবার বেশিরভাগ ধর্মীয় মতবাদ অনুসারে, স্বর্গে মানুষের সৃষ্টি। সেখানে থেকে পৃথিবীতে মানুষ এসেছে। চলুন জানা চেষ্টা করি মানুষের সৃষ্টি কোথায়, পৃথিবীতেই বা এলো কীভাবে?
বিখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান বলেছিলেন, ‘মানুষ নক্ষত্রের উপাদান দিয়ে তৈরি’। এই কথার দ্বারা তিনি কি বোঝাতে চেয়েছিলেন এবং তার এই তত্ত্বটির কতটুকু সত্যতা আছে।

১৯৮০ সালের শুরুর দিকে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান ‘কসমস: আ পারসোনাল ভয়েজ’ নামে বিজ্ঞান বিষয়ক ১৩ পর্বের একটি টেলিভিশন সিরিজ পরিচালনা ও উপস্থাপনা করেছিলেন যা মার্কিন গণমাধ্যম পিবিএস-এ সম্প্রচারিত হয়েছিল। ওই শোতে সেগান পৃথিবীর ইতিহাস, বিবর্তন, প্রাণের উৎপত্তি এবং সৌরজগতসহ বিজ্ঞান-সম্পর্কিত অনেক জটিল বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন।
এর একটি পর্বে সেগান বলেছিলেন, আমরা নিজেকে জানার মাধ্যমে মহাবিশ্বকে জানতে পারি। কারণ আমরা নিজের মধ্যে মহাবিশ্বকে ধারণ করি। আমাদের সত্তার কিছু অংশ জানে যে আমরা পৃথিবীতে কীভাবে এসেছি এবং কোথায় ফিরে যাব। নক্ষের উপাদান থেকে আমাদের সৃষ্টি হয়েছে।
সেগানের এই মতবাদের স্বপক্ষে অনেকেই একমত পোষণ করেছেন। তাদের মধ্য অন্যতম অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক ক্রিস ইম্পি। অধ্যাপক ক্রিস ইম্পি বলেছেন, আমাদের দেহে কার্বন, নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেন পরমাণুগুলির পাশাপাশি অন্যান্য সমস্ত ভারী উপাদানের পরমাণুগুলি ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে নক্ষত্রের পূর্ববর্তী প্রজন্মের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল। মানুষসহ প্রত্যেক প্রাণী (পাশাপাশি পৃথিবীর বেশিরভাগ পদার্থ) এই উপাদানগুলি ধারণ করে। তাই আক্ষরিক অর্থে আমরা নক্ষত্রের উপাদান থেকেই সৃষ্টি।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ইম্পি আরও যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যেসব জৈব পদার্থ কার্বন ধারণ করে তারা সবাই মূলত নক্ষত্রের ভিতরে সৃষ্টি হয়েছিল। মহাবিশ্বে শুরুর দিকে মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছিল। কার্বন পরবর্তীকালে, বিলিয়ন বছর ধরে তৈরি হয়েছিল।
যখন একটি নক্ষত্রে হাইড্রোজেনের সরবরাহ শেষ হয়ে যায়, তখন বিকট বিস্ফোরণে এর মৃত্যু হয় যাকে বলা হয় ‘নোভা’। বড় মাপের নক্ষত্রকে বলা হয় সুপারনোভা। ওয়ার্ল্ড বুক এনসাইক্লোপিডিয়া, ২০০৫ অনুসারে, একটি সুপারনোভার (বড় মাপের নক্ষত্র) বিস্ফোরণে সূর্যের চেয়ে কোটি কোটি গুণ বেশি আলোর বিচ্ছুরণ হতে পারে। নক্ষের এমন বিস্ফোরণের ফলে মহাকাশে ধূলিকণা ও গ্যাসের বিশাল মেঘের সৃষ্টি হয়। এটি নক্ষত্রে আকার, গঠন ও উপাদানের উপর নির্ভর করে।
একটি সুপারনোভা সৃষ্টি হওয়ার প্রথম কয়েকদিন পর এটি তার সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতায় পৌঁছে। এর উজ্জলতা এতটাই তীব্র হতে পারে যে এটি পুরো গ্যালাক্সিকে আলোকিত করতে পারে। এটি নিঃশেষ হওয়ার আগে কয়েক সপ্তাপ ধরে এমন তীব্রভাবে জ্বলতে থাকতে পারে।
এরপর একটি সুপারনোভা থেকে উপাদানগুলো তার সৌরজগতের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। ‘কসমিক কলিউশনস: দ্য হাবল অ্যাটলাস অফ মার্জিং গ্যালাক্সিস’ (স্প্রিংগার, ২০০৯) অনুসারে, প্রাচীনতম নক্ষত্রগুলি প্রায় একচেটিয়াভাবে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম নিয়ে গঠিত, যার মধ্যে অক্সিজেন এবং মহাবিশ্বের বাকি ভারী উপাদানগুলি পরে সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে আসে। প্রকৃতপক্ষে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সোনা, রুপা ও প্ল্যাটিনামের মতো ভারী উপাদানগুলো মহাবিশ্বের কাছাকাছি জায়গায় সুপারনোভা অবশিষ্টাংশ থেকে আবিষ্কার করেছেন। শুরুর দিকে এগুলো ছায়াপথে উজ্জ্বল বস্তুরূপে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল।

শেষ দিকে অধ্যাপক ক্রিস ইম্পি একটি পরীক্ষিত তত্ত্বের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, নক্ষত্র বা তারকারা তাদের আয়ুষ্কালের শেষ দিকে ভারী উপাদান সৃষ্টি করে এবং তাদের ভিতরের গ্যাস নির্গত করে দেয়, যাতে করে এই উপাদানগুলো পরবর্তীতে অন্য কোনো নক্ষত্র বা গ্রহের (এবং মানুষের) অংশ হতে পারে।
তাই পৃথিবীর সমস্ত জীবন এবং আমাদের দেহের উপাদানগুলি কোনো না কোনো নক্ষত্রের ভিতরে তৈরি হয়েছিল। যে নক্ষত্রগুলো অনেক আগেই বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
তাই অধ্যাপক ইম্পি মনে করেন কার্ল সেগান সঠিক কথাই বলে গিয়েছেন।
তথ্যসূত্র: লাইভ সাইন্স










































