
আপনি কি জানেন, ভারতের একসময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য—মুঘল সাম্রাজ্যের পতন—শত শত বছর আগেই নাকি লেখা ছিল এক সম্রাটের জন্মকুণ্ডলীতে? মুঘল বাদশাহদের জীবন, সিংহাসন আর যুদ্ধযাত্রা—সবকিছুই চলত চাঁদ-তারার গতিপথ দেখে! কিন্তু এই জ্যোতিষবিদ্যাই কি শেষ পর্যন্ত আওরঙ্গজেবের হাতে তুলে দিয়েছিল সাম্রাজ্য-ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী?
জ্যোতিষে মুঘলদের গভীর বিশ্বাস এবং সম্রাট আওরঙ্গজেবের সেই ভয়ঙ্কর জন্মকুণ্ডলী নিয়ে নিচে দেওয়া হলো সেই চাঞ্চল্যকর ইতিহাস :
মুঘল দরবার: জ্যোতিষীর অবিচ্ছেদ্য স্থান
বহু মানুষের কাছে জ্যোতিষবিদ্যা একটি সাধারণ বিশ্বাস হলেও, মুঘল সাম্রাজ্যে এর গুরুত্ব ছিল আকাশছোঁয়া। ইতিহাসবিদ এম জে আকবর তাঁর ‘আফটার মি. ক্যায়স’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর বা আওরঙ্গজেব—সবাই ছিলেন জ্যোতিষশাস্ত্রে গভীর বিশ্বাসী।
জ্যোতিষীরা সম্রাটের দরবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। আকবর তাঁর দিনকার পোশাকের রংও (যেমন: রবিবার হলুদ, সোমবার সবুজ) নক্ষত্রের গতিপথ অনুসারে নির্বাচন করতেন।
কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত আওরঙ্গজেবও প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নিয়মিত জ্যোতিষীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। এমনকি ১৬৬৪ সালের ৬ই ডিসেম্বর দাক্ষিণাত্যের দীর্ঘ যাত্রার জন্য তিনি শুভ মুহূর্তও জ্যোতিষীর কাছ থেকে জেনে নিয়েছিলেন।
মুঘল বাদশাহরা মনে করতেন, ধর্মভিত্তিক গোঁড়ামির চেয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আর নক্ষত্রের নির্দেশনা সেই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।
আকবরের জন্ম ও নিয়তির প্রহসন: প্রসব থামিয়ে দিয়েছিলেন জ্যোতিষী!
মুঘলদের জ্যোতিষ-বিশ্বাসের সবচেয়ে নাটকীয় প্রমাণ মেলে সম্রাট আকবরের জন্মক্ষণে। ১৫৪২ সালের ১৫ অক্টোবর আকবরের জন্ম। তাঁর ব্যক্তিগত জ্যোতিষী মৌলানা চাঁদ দেখেন যে, শুভ-মুহূর্তের আগেই প্রসব হতে চলেছে। প্রসব সামান্য দেরিতে হলে হাজার বছরে একবার ঘটা এক দুর্লভ নক্ষত্র-সংযোগ ঘটবে।
শুভ মুহূর্ত নিশ্চিত করতে, মৌলানা চাঁদ ধাত্রীদের অনুরোধ করেন প্রসব সাময়িক থামাতে। ধাত্রীরা অপারগ হলে, আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’ অনুসারে, মৌলানা চাঁদ এক ধাত্রীকে ভয়ঙ্কর সাজে সজ্জিত করে অন্ধকারে হামিদা বেগমের (আকবরের মা) কাছে আনেন। ভয়ে রাণীর প্রসববেদনা থেমে যায়!
শুভ মুহূর্ত ঘনিয়ে এলে রাণী আকস্মিক জেগে ওঠেন এবং আকবরের জন্ম হয়। এই জন্মকুণ্ডলীই হুমায়ুনকে নিশ্চিত করেছিল যে তাঁর পুত্র দীর্ঘকাল রাজত্ব করবে।
এই জ্যোতিষ-নির্ভরতা মুঘলদের যুদ্ধযাত্রা, সিংহাসন পুনর্দখল (হুমায়ুন) এবং এমনকি শিশুদের শিক্ষা শুরুর ক্ষণ (আকবরের চার বছর চার মাস চার দিন বয়সে) পর্যন্ত নির্ধারণ করত।
আওরঙ্গজেবের সেই ভয়ঙ্কর জন্মকুণ্ডলী: সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত ভবিষ্যদ্বাণী
দীর্ঘজীবী সম্রাট আওরঙ্গজেবই ছিলেন সেই শাসক, যাঁর কুণ্ডলীতে লেখা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের পতন! ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার তাঁর ‘দ্য হিস্ট্রি অফ আওরঙ্গজেব’ বইতে বর্ণনা করেছেন আওরঙ্গজেবের রাজ্যাভিষেকের (১৬৫৮ সালের ৫ জুন) মুহূর্তটিও জ্যোতিষীরাই নির্ধারণ করেছিলেন।
কিন্তু সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি দেন স্বয়ং আওরঙ্গজেব। তিনি তাঁর পুত্রকে জানান যে, জ্যোতিষী ফজিল আহমেদ-এর তৈরি করা তাঁর জন্মকুণ্ডলীর প্রতিটি ভবিষ্যদ্বাণীই মিলে গেছে। আর সেই কুণ্ডলীতেই ছিল চূড়ান্ত সতর্কবার্তা:
‘‘আমার চলে যাওয়ার পরে চারদিকে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়বে। আমার পরে এমন একজন সম্রাট আসবেন, যিনি অজ্ঞানী হবে এবং তার চিন্তাভাবনা হবে সংকীর্ণ।’’
তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, তাঁর দক্ষ উজির আসাদ খাঁ-কে তাঁর চার পুত্র কোনো কাজ করতে দেবে না। এই ভবিষ্যদ্বাণী মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের প্রাথমিক কারণগুলোর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়!
যখন নক্ষত্রের বাণী মিথ্যা হয়
তবে জ্যোতিষীরা সর্বদা নির্ভুল ছিলেন না। মুঘলদের প্রতিষ্ঠাতা বাবর এই বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। জ্যোতিষী মুহাম্মদ শরিফ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, খানওয়ার যুদ্ধে বাবরের জয় হবে না, কারণ নক্ষত্র অনুকূলে নেই।
বাবর সেই ভবিষ্যদ্বাণীতে কর্ণপাত করেননি। তিনি সৈন্যদের বলেন, যদি যুদ্ধ করে নিহত হন তবে শহীদের মর্যাদা পাবেন, আর জয়ী হলে যশ ও প্রতিপত্তি বাড়বে। তিনি যুদ্ধ করলেন এবং জয়ী হলেন।
ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হওয়ায় বাবর মুহাম্মদ শরিফকে দোষারোপ করেন এবং তাঁকে পদচ্যুত করে কাবুলে নির্বাসন দেওয়া হয়।
মুঘল সাম্রাজ্যে জ্যোতিষ কেবল একটি ধর্মীয় বা সামাজিক বিশ্বাস ছিল না; বরং এটি ছিল ক্ষমতা, রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাসের উৎস। আকবরের মতো বিচক্ষণ শাসক থেকে আওরঙ্গজেবের মতো দৃঢ়চেতা সম্রাট—সবাই নক্ষত্রের গতিপথকে শাসনকার্যের এক অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের জন্মকুণ্ডলীর সেই ‘ভয়ঙ্কর’ ভবিষ্যদ্বাণী কি সত্যিই মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে সিলমোহর দিয়েছিল, নাকি এটি ছিল অভ্যন্তরীণ কোন্দলের একটি কাব্যিক বর্ণনা? উত্তর যাই হোক, মুঘলদের জীবন-চরিত্রে জ্যোতিষের গভীর প্রভাব ইতিহাসের পাতায় এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।
লেখা : বিবিসি অবলম্বনে

























The article is outstanding and very helpful. The site keeps
surprising me with its usefulness.
Thanks. keep following and stay with us.