অর্থনীতির রঙ্গমঞ্চে যখন প্রযুক্তির জয়ধ্বনি, সেই ক্ষণেও কেন শেয়ারবাজারে বিষাদের ছায়া? গত ১৯ নভেম্বর বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং যখন ঘোষণা করলেন যে তাদের সবচেয়ে উন্নত চিপগুলোর বিক্রি আকাশচুম্বী তখন যেন এক বিজয়গাঁথা রচিত হলো। সংস্থাটি অক্টোবর পর্যন্ত তিন মাসে ৫৭ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব ঘরে তুলেছে, আর তাদের গ্রস মুনাফার মার্জিন ৭০%-এর মাইলফলক পেরিয়েছে–এ যেন বিনিয়োগকারীদের কল্পনারাজ্যের স্বর্ণশিখর।

তবে, এই বিপুল সাফল্যের উল্লাসের ঠিক পরেই, পরদিন এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম ৩% আকস্মিকভাবে কমে যায়। বর্তমানে যা অক্টোবরে স্পর্শ করা শিখর থেকে ১৩% নিচে অবস্থান করছে। এ যেন প্রদীপের নিচে ঘন অন্ধকার!

বাজারের মেজাজ যেন এক রাতারাতি পরিবর্তনশীল স্রোত। বছর ধরে যে আশাবাদে শেয়ারের দাম আকাশ ছুঁয়েছিল—এই বিশ্বাসে যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) লাভের অঙ্ককে মহীরুহ করে তুলবে—আজ তা অনেক পেশাদার বিনিয়োগকারীর চোখে অতিরিক্ত আশাবাদ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তাদের কপালে এখন এক ধরনের চিন্তার ভাঁজ দেখা যাচ্ছে।

শীর্ষ ৫০০টি কোম্পানির বাজার-মূলধন সূচকটি অক্টোবরের চূড়া থেকে ৪% কমলেও, এটি ২০২২ সালের সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে ৮৪% ওপরে। এই পতন হয়তো আপাতদৃষ্টিতে সহনীয়, কিন্তু যখন সুসংবাদেও শেয়ারের পতন ঘটে, তখন তা এক গভীর ইঙ্গিত দেয়–দীর্ঘদিনের ঊর্ধ্বমুখী বাজার হয়তো তার প্রাণশক্তি হারাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এখন চরম উৎকণ্ঠায়, যেন কোনো আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাসে সমুদ্র তীরবর্তী জনপদ।

একটি রক্তিম সতর্কবার্তা ইতোমধ্যে জ্বলে উঠেছে। বাজারের মনস্তত্ত্ব যেন দিশেহারা। এনভিডিয়ার আয়ের খবরের পর শেয়ারের দাম প্রায় ৫% লাফিয়ে উঠলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পতনশীল হয়ে দিনের শেষে লালে থমকে গেল। এ যেন মুহূর্তের আলো-আঁধারি খেলা।

অন্যদিকে, ওয়াল স্ট্রিটের ‘ভয় সূচক’ নামে পরিচিত যা প্রত্যাশিত ওঠানামা পরিমাপ করা হয়, তা ছিল চরম অস্থির। সাধারণত দৈনিক ১-২ শতাংশের হেরফের যেখানে স্বাভাবিক, সেখানে ২০ নভেম্বর মাত্র তিন ঘণ্টায় এটি ১৯ থেকে ২৮-এ ঘোরাফেরা করেছে। এ এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত—বিনিয়োগকারীরা এখন আর আত্মবিশ্বাসী নন যে এনভিডিয়ার মতো চমকপ্রদ ফলাফলও শেয়ারের দামকে আরও ঊর্ধ্বে টেনে নিয়ে যেতে পারবে, কারণ মূল্যমানের পারদ ইতিমধ্যেই বহু দূর চড়েছে।

যদি বিনিয়োগকারীদের চিরাচরিত নিরাপদ আশ্রয়স্থলগুলোয় নির্ভরযোগ্যতা হারায়, তবে তা হবে দ্বিতীয় সতর্কবার্তা। যদিও ডলার সম্প্রতি তার নিরাপদ ভূমিকার পুনরুদ্ধার করেছে, কিন্তু সোনার মূল্য, যা অস্থিরতার বিরুদ্ধে এক ঐতিহ্যবাহী রক্ষাকবচ, তা অক্টোবরে শিখর স্পর্শ করার পর থেকে ৭% হ্রাস পেয়েছে। গত সপ্তাহের টালমাটালের মধ্যেও এর দাম ছিল প্রায় স্থির। সোনা নিজেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক ‘বুল রান’-এর মধ্য দিয়ে গেছে, যা এর মূল্যকে সর্বকালের সর্বোচ্চে নিয়ে গেছে এবং এই আশঙ্কাই জন্ম দিয়েছে যে এই মূল্যবান ধাতু নিজেও এক বুদ্বুদে আটকা পড়েছে। যদি ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির হেজিংয়ের জন্য সোনার ওপর নির্ভর করতে না পারেন, তবে পরবর্তী ধসটি হবে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।

তৃতীয় অমঙ্গলের পূর্বাভাস হলো বিভিন্ন সম্পদের দামের মধ্যে স্বাভাবিক পারস্পরিক সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া। বর্তমানে জাপানের বাজার এ উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। গত সপ্তাহের অস্থিরতায় তার মুদ্রা—যা একসময় নিরাপদ আশ্রয় ছিল—তা বিক্রি হয়ে গেল, অথচ একই সাথে এশীয় শেয়ারের দামও কমল এবং জাপানের ঋণ গ্রহণের খরচ বাড়ল। ২০ নভেম্বর জাপানিজ সরকারি বন্ডের ১০ বছরের ইল্ড ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ (১.৮%) এবং ৩০ বছরের ইল্ড সর্বকালের সর্বোচ্চ (৩.৪%) ছুঁয়েছে। এই গতিশীলতা উদীয়মান বাজারের কথা মনে করিয়ে দেয়, যা বসন্তে আমেরিকার মুদ্রা, শেয়ার এবং ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।

তবে এই মুহূর্তে ব্যবসায়ীরা পুরোপুরি আতঙ্কিত নন, যদিও তাদের মুনাফার ওপর বিপদ বাড়ছে। এর কারণ সম্ভবত তাদের স্মৃতিতে ডটকম বুমের সেই শিক্ষাটি উজ্জ্বল: ২০০০ সালে বুদ্বুদ ফাটানোর আগে ১৯৯৫ সাল থেকে সূচক কমপক্ষে ১২ বার ১০%-এর বেশি সংশোধন পার করেছিল। সেই সময়েও, যারা সাহস ধরে রেখেছিলেন এবং বিক্রি করেননি, তারা প্রায় ১,১০০% লাভ করেছিলেন।

আজকের বিনিয়োগকারীরা তাই ভাবছেন—গত সপ্তাহের এই বিক্রি-হ্রাস কি আরও দ্রুত হবে? হয়তো হবে। তবে তারা একই সাথে জানেন, এখন বাজার থেকে সরে যাওয়াটা ভুল প্রমাণিত হতে পারে, যেমনটা অতীতে বহুবার হয়েছে। এই দ্বিধার দোলাচলই এখন অর্থনীতির অঙ্গনে মূল কাব্য—লাভ ও ক্ষতির এক চিরন্তন স্নায়ুর যুদ্ধ।

তথ্য সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট, বিজ নিউজ

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *