ইমদাদুল হক জুয়েল
বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই সৌদি আরব বা রাশিয়ার নাম নেবেন। কিন্তু সমসাময়িক বাস্তবতায় অবাক করা তথ্য হলো, বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ খোদ আমেরিকা। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র একইসঙ্গে তেল আমদানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় এবং রপ্তানিতে চতুর্থ।

তাহলে প্রশ্ন জাগে, যে দেশ নিজে তেলের ওপর ভাসছে, তারা কেন ভেনেজুয়েলার মতো একটি অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত দেশের তেলের জন্য এতোটা মরিয়া? উত্তরটা লুকিয়ে আছে তেলের রসায়ন এবং মার্কিন শোধনাগারগুলোর বিশেষ অবকাঠামোয়।

তেলের রূপভেদ: হালকা বনাম ভারী
আমরা সাধারণত মনে করি খনি থেকে পাওয়া সব তেলই এক। কিন্তু ভূ-তাত্ত্বিক কারণে তেলের ঘনত্ব ও মান ভিন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের খনিগুলো থেকে এখন মূলত ‘হালকা’ তেল পাওয়া যায়, যা দেখতে অনেকটা শরবতের মতো স্বচ্ছ। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার তেল অত্যন্ত ‘ভারী’, যা অনেকটা অর্ধ-কঠিন আলকাতরা বা কাদার মতো। এই ভারী তেলে প্রচুর সালফার থাকে এবং এটি প্রক্রিয়াজাত করা অত্যন্ত জটিল।

ইতিহাসের ফাঁদে মার্কিন রিফাইনারি
মজার ব্যাপার হলো, ভেনেজুয়েলার এই ‘অভিশপ্ত’ ভারী তেলই আমেরিকার জন্য পরম আশীর্বাদ। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বিশাল তেল শোধনাগার বা রিফাইনারিগুলো তৈরি হয়েছিল গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। সেসময় আমেরিকায় পাওয়া যেত ভারী তেল। ফলে ক্যালিফোর্নিয়া, লুইজিয়ানা বা টেক্সাসের রিফাইনারিগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে তারা ঘন ও চটচটে তেলকে পেট্রোল বা ডিজেলে রূপান্তর করতে পারে।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে ‘ফ্র্যাকিং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা প্রচুর হালকা তেল উৎপাদন শুরু করলেও তাদের রিফাইনারিগুলো রয়ে গেছে সেই পুরনো কাঠামোর। হালকা তেল এসব রিফাইনারিতে পর্যাপ্ত মুনাফা দেয় না। ফলে মার্কিন অর্থনীতি সচল রাখতে এবং কয়েক মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে প্রচুর পরিমাণে ভারী তেল আমদানি করা ছাড়া আমেরিকার হাতে কোনো বিকল্প নেই।

বিকল্পহীন আমেরিকা ও বিরল ভারী তেল
বিশ্বের খুব কম দেশে এই বিশেষ ধরনের ভারী তেল পাওয়া যায়। মূলত তিনটি দেশ এর প্রধান উৎস: কানাডা, রাশিয়া এবং ভেনেজুয়েলা। কানাডা থেকে আমেরিকা প্রচুর তেল নেয়, তবে তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। আর ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে রাশিয়া থেকে তেল আনা বর্তমানে আমেরিকার জন্য অসম্ভব। তাই ভৌগোলিক নৈকট্য এবং তেলের গুণগত মানের কারণে ভেনেজুয়েলাই মার্কিন শোধনাগারগুলোর জন্য সবচেয়ে আদর্শ উৎস।

গ্লোবাল কনসালটেন্সি রাইস্ট্যাড এনার্জির ভাইস-প্রেসিডেন্ট জনিভ শাহের মতে, ‘ভেনেজুয়েলার বেশিরভাগ অপরিশোধিত তেলই হলো ভারী ও অম্লীয়। আপনি যদি একজন মার্কিন তেল পরিশোধনকারী হন, তবে এটি আপনার জন্য অন্যতম আদর্শ মানের তেল।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে মার্কিন শোধনাগারগুলো কানাডা থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে এবং কলম্বিয়া ও মেক্সিকো থেকে ভারী তেল আমদানি করে। তবে ভেনেজুয়েলার তেল হবে এগুলোর অতিরিক্ত প্রাপ্তি, আর ভৌগোলিক নৈকট্যও একটি বড় সুবিধা।’

অর্থনীতির চাকা ও ‘জব মাল্টিপ্লায়ার’
অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স-এর তথ্যমতে, মার্কিন তেল শোধনাগারগুলোতে সরাসরি ৮০ হাজার মানুষ কাজ করলেও এর ওপর নির্ভর করে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। একে বলা হয় ‘জব মাল্টিপ্লায়ার। অর্থাৎ, এই খাতে একটি চাকরির বিপরীতে আরও ৪৫টি পরোক্ষ চাকরির সুযোগ তৈরি হয়। এই বিশাল শিল্পকে বাঁচাতে হলে ভেনেজুয়েলার তেলের বিকল্প নেই। কিন্তু নিকোলাস মাদুরোর শাসনামলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই সরবরাহ প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। নব্বইয়ের দশকের ২০ লাখ ব্যারেল আমদানি এখন মাত্র ১ লাখ ৩৫ হাজার ব্যারেলে এসে ঠেকেছে।

ভবিষ্যৎ কী?
ট্রাম্প প্রশাসন থেকে শুরু করে বর্তমান মার্কিন নীতি নির্ধারকদের বড় লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার ওপর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তার করা। তবে কাজটা সহজ নয়। গ্লোবাল কনসালটেন্সি রাইস্ট্যাড এনার্জি-র মতে, ভেনেজুয়েলার ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো মেরামত করে উৎপাদন আগের অবস্থায় নিতে প্রায় ১৬ বছর সময় এবং ১৮৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন।

ভেনেজুয়েলার তেল শুধু জ্বালানি নয়, বরং মার্কিন শিল্প কাঠামোর একটি অপরিহার্য অঙ্গ। মার্কিন শোধনাগারগুলো যে ‘খাদ্যে’ অভ্যস্ত, তা কেবল ভেনেজুয়েলার খনিতেই সুলভে পাওয়া সম্ভব। তাই ভূ-রাজনীতির খেলায় ভেনেজুয়েলা যতই শত্রু হোক না কেন, নিজের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে আমেরিকার কারাকাসের সেই কালো ঘন তেল পেতেই মরিয়া হয়ে উঠল।

তথ্য সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন, এনডিটিভি

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *