
হেডফোন কানে গুঁজে গান শুনছেন, কিংবা ফোন থেকে স্পিকারে ফাইল পাঠাচ্ছেন। প্রতিদিন কতবারই না আমরা ব্লুটুথ অন করি! কিন্তু নামটা এমন কেন, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এক ভাইকিং রাজার গল্পে।
ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে জুটল্যান্ড অঞ্চলে ছোট্ট একটি শহর জেলিং। এখন বাসিন্দা মাত্র চার হাজারের মতো, কিন্তু একসময় এটি ছিল ক্ষমতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
এখানে দাঁড়িয়ে আছে দুটি বিশাল রুনিক পাথর, যাতে খোদাই করা আছে দশম শতকের ইতিহাস। ছোট ও পুরোনো পাথরটি বসিয়েছিলেন রাজা গর্ম, স্ত্রী থাইরার স্মৃতিতে। ধারণা করা হয়, ডেনমার্ক নামটির প্রথম লিখিত উল্লেখ এই পাথরেই। তাই স্থানীয়রা একে বলেন ডেনমার্কের জন্মসনদ।
বড় পাথরটি বসান গর্মের ছেলে হ্যারাল্ড। এতে লেখা আছে, তিনি ডেনমার্ক ও নরওয়ে নিজের শাসনে এনেছেন এবং ডেনিশদের খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করেছেন। পাথরের এক পাশে খোদাই করা যিশুখ্রিষ্টের ছবিটি স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় পাওয়া এ ধরনের প্রাচীনতম চিত্রগুলোর একটি বলে ধরা হয়।
ব্লুটুথ ডাকনামের রহস্য
রাজা হ্যারাল্ড গর্মসনের ডাকনাম ছিল প্রাচীন নর্স ভাষায় ব্লাতন অর্থাৎ নীল দাঁত। ইতিহাসবিদদের ধারণা, তার একটি দাঁত হয়তো পচে গিয়ে নীলচে-কালচে হয়ে গিয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, তার মৃত্যুর প্রায় দেড়শ বছর পর প্রথম লিখিত নথিতে এই ডাকনামের দেখা মেলে।
আনুমানিক ৯৬৫ সালের দিকে হ্যারাল্ড ডেনমার্কে খ্রিষ্টধর্ম প্রচলন করেন। সে সময় উত্তর ইউরোপ ছিল ছোট ছোট ভূখণ্ডে বিভক্ত, আর শাসন করতেন বিভিন্ন গোত্রপ্রধান।
নতুন ধর্ম গ্রহণ হ্যারাল্ডের সামনে দুটি দরজা খুলে দেয়—নিজের ক্ষমতাকে এক জায়গায় সংহত করার সুযোগ। খ্রিষ্টান ইউরোপীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা, যা ডেনমার্ককে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
জেলিংয়ের কিংস জেলিং জাদুঘরের কিউরেটর অ্যাডাম বাকের মতে, ভাইকিং যুগের প্রায় ২০০ বছর পর ডেনমার্কে রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তখন উত্তর ইউরোপের মানুষকে ধীরে ধীরে শিখতে হয়েছে ইউরোপীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেমন, ধর্ম কীভাবে শাসনের হাতিয়ার হতে পারে এবং ক্ষমতা কীভাবে কেন্দ্রীভূত করা যায়।
জেলিং তাই শুধু যুদ্ধজয়ী ভাইকিং বা থর-ওডিনের গল্প বলে না। এটি পুরোনো বিশ্বাস থেকে নতুন ব্যবস্থায় উত্তরণের গল্প। একসময় জায়গাটি ছিল পৌত্তলিকদের সমাধিস্থল। হ্যারাল্ডের আমলে সেখানে প্যাগান ও খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্য পাশাপাশি টিকে ছিল। আজও সেখানে আছে দুটি সমাধির ঢিবি ও একটি গির্জা। কাঠের বেড়ার জায়গায় বসানো সাদা খুঁটি আর শত শত চিহ্ন দিয়ে দেখানো হয়েছে বিশাল এক জাহাজের আকৃতির কাঠামোর সীমানা, যা সম্ভবত রাজমাতা থাইরার স্মরণে তৈরি। ১৯৯৪ সালে ইউনেসকো জেলিংকে ডেনমার্কের প্রথম বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়।
১৯৯০-এর দশকে এক প্রকৌশলীর বইপড়া
এবার আসা যাক প্রযুক্তির গল্পে। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে তোশিবা, আইবিএম, নকিয়া, ইন্টেল ও এরিকসনের মতো প্রতিষ্ঠান একটি কাজে হাত দেয়। বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি যন্ত্রকে তার ছাড়াই একে অপরের সঙ্গে কথা বলানো। তখনকার সময়ে এটি ছিল বেশ কঠিন কাজ, কারণ প্রতিটি কোম্পানির প্রযুক্তি ছিল আলাদা।
এই প্রকল্পের জন্য একটি সাংকেতিক নাম দরকার ছিল। ইন্টেলের প্রকৌশলী জিম কার্ডাচ তখন সুইডিশ সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করছিলেন। আলোচনার ফাঁকে ভাইকিংদের প্রসঙ্গ উঠলে তার আগ্রহ জাগে এবং তিনি ভাইকিং ইতিহাসের একটি বই পড়তে শুরু করেন। বইটি এখন জেলিংয়ের দর্শনার্থী কেন্দ্রে প্রদর্শিত হচ্ছে।
সেই বইয়ে তিনি পরিচিত হন হ্যারাল্ড ব্লুটুথের সঙ্গে, যিনি ডেনমার্ক ও নরওয়েকে এক করেছিলেন। কার্ডাচের মনে হলো, এই প্রযুক্তিও তো একই কাজ করবে, অর্থাৎ আলাদা আলাদা কোম্পানির যন্ত্রকে এক সুতোয় বাঁধবে। অস্থায়ী কোডনাম হিসেবে তিনি বেছে নিলেন ব্লুটুথ।
অস্থায়ী নাম যখন স্থায়ী হয়ে গেল
আসল নামের তালিকায় ছিল আরও কিছু প্রস্তাব, যেমন পিএএন (পারসোনাল এরিয়া নেটওয়ার্কিং) ও রেডিওওয়্যার। প্রযুক্তিগতভাবে এসব নাম ছিল স্পষ্ট, কিন্তু বেশ একঘেয়ে। এদিকে অনানুষ্ঠানিক নাম ব্লুটুথ আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির আগেই প্রকাশ্যে চলে আসে। জনসংযোগ দলের অনেকেই নামটি পছন্দ করেননি, কারণ শুনলে দাঁতের অপরিচ্ছন্নতার কথা মনে পড়ে। তবু অদ্ভুত, স্বতন্ত্র আর সহজে মনে রাখার মতো হওয়ায় নামটি টিকে গেল। কিউরেটর অ্যাডাম বাকও মনে করেন, এই বৈশিষ্ট্যই নামটিকে দ্রুত জনপ্রিয় করেছে। ১৯৯৮ সালে প্রযুক্তিটির উন্নয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য গঠিত হয় ব্লুটুথ স্পেশাল ইন্টারেস্ট গ্রুপ।
লোগোতে লুকিয়ে থাকা রুনিক অক্ষর
ব্লুটুথের নীল লোগোটি দেখতে অনেকটা অদ্ভুত এক চিহ্নের মতো। আসলে এটি প্রাচীন নর্স রুনিক বর্ণমালার দুটি অক্ষরের মিলিত রূপ। একটি ᚼ (হ্যাগাল), অন্যটি ᛒ (বার্কান)। এ দুটি রাজা হ্যারাল্ড ব্লুটুথের নামের আদ্যক্ষর H ও B-এর প্রতিনিধিত্ব করে। অর্থাৎ প্রতিবার ফোনের স্ক্রিনে ব্লুটুথের আইকন দেখলে আপনি আসলে এক ভাইকিং রাজার মনোগ্রামই দেখছেন।
হাজার বছর পরের ক্ষমা প্রার্থনা
২০২৩ সালে ব্লুটুথের ২৫ বছর পূর্তিতে জিম কার্ডাচ ও কয়েকজন উদ্যোক্তা কিংস জেলিং জাদুঘরে যান। সেখানে তারা মজা করে রাজা হ্যারাল্ডের অনুমতি ছাড়া নাম ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চান। জাদুঘর কর্তৃপক্ষও হাসিমুখে সেই ক্ষমা গ্রহণ করে এবং আগামী এক হাজার বছর পর্যন্ত প্রযুক্তিটির নাম হিসেবে ব্লুটুথ ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
অ্যাডাম বাকের ভাষায়, হ্যারাল্ড নিজের কৃতিত্ব জাহির করতে ভালোবাসতেন। আজ প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ তার নাম উচ্চারণ করছে জানলে তিনি নিশ্চয়ই খুশিই হতেন।
দশম শতকের এক রাজা চেয়েছিলেন বিচ্ছিন্ন জনপদকে এক করতে। এক হাজার বছর পর তার ডাকনামই হয়ে গেল সেই প্রযুক্তির নাম, যা বিচ্ছিন্ন যন্ত্রকে জুড়ে দেয়। ইতিহাস এভাবেই মাঝে মাঝে আমাদের পকেটের ভেতরে ঢুকে পড়ে।













