রোজারিওর ধুলোমাখা এক মাঠ। বয়স মোটে চার। বল এলো পায়ের কাছে, লাজুক ছেলেটা প্রথমবার বুঝলই না কী করতে হবে—বলটা এগিয়ে গেল অন্যদিকে। কিন্তু দ্বিতীয়বার যখন বল এলো, যেন কোনো এক গোপন সুইচ অন হয়ে গেল। ছোট্ট পা বলের সঙ্গে মিশে গেল, প্রতিপক্ষ একে একে পেছনে পড়তে লাগল। কেউ তখনও জানত না, এই একটা মুহূর্ত থেকেই শুরু হচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় এক জীবনকাহিনি।

সেই ছেলেটাই লিওনেল মেসি—যিনি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন এমন এক পরিণতিতে দাঁড়িয়ে, যেখানে তাকে ঘিরে আছে গোটা দেশের নিঃশর্ত ভালোবাসা। অথচ এই পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মেসিকে সহ্য করতে হয়েছে নিজের দেশেই তীব্র অবিশ্বাস, তুলনা আর কটাক্ষ।

যেদিন কেঁদেছিল গোটা দেশ
২০১৬ সালের জুন মাস। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে পেনাল্টি নষ্ট করলেন মেসি। জন্মদিনের মাত্র দুদিন পরের এই ব্যর্থতা যেন ছিল বাঁধ ভাঙা পানির শেষ ফোঁটা। এর আগেও ২০০৭ ও ২০১৫ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনাল হাতছাড়া হয়েছে, ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরেছে আর্জেন্টিনা।

শিরোপাহীনতার এই দীর্ঘশ্বাস আর নিতে পারলেন না মেসি। চোখ ভেজা রেখে জানিয়ে দিলেন, জাতীয় দলের অধ্যায় তার শেষ।
সেই রাতে গোটা আর্জেন্টিনা কেঁদেছিল। একজন সমর্থক পরে স্মরণ করেছিলেন, সেই কান্নাই যেন প্রথমবার স্পষ্ট করে দিয়েছিল—মানুষ মেসিকে কতটা চেয়েছিল, ঠিক ততটাই তীব্র ছিল তাদের প্রত্যাশার চাপও।

‘ঠান্ডা বুকের’ ছেলেটা
মেসির সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ মাঠের বাইরেও ছিল—আর সেটা একটা নাম, একটা ছায়া: দিয়েগো ম্যারাডোনা। ৩০ পেরোনোর আগেই আটটি লা লিগা, চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ আর পাঁচটি ব্যালন ডি’অর জিতে ফেলা মেসির জাতীয় দলের সাফল্যের খাতায় তখন কেবল একটা অলিম্পিক সোনা। বিপরীতে ম্যারাডোনা প্রায় একার কাঁধে ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন—এই তুলনা মেসিকে তাড়া করে বেড়াত প্রতিটা ব্যর্থতার পর।

আর্জেন্টিনায় তাকে ডাকা হতো “পেচো ফ্রিও”—স্প্যানিশে যার অর্থ “ঠান্ডা বুক”। মানে, বড় মঞ্চে দরকারি আবেগ বা জেদ তার মধ্যে নেই। অথচ যারা তাকে কাছ থেকে চিনতেন, তারা জানতেন উল্টো কথা—হারের পর ভেতরে ভেতরে গুঁড়িয়ে যেতেন মেসি। বার্সেলোনায় যেখানে প্রতি সপ্তাহে ভালোবাসা আর সম্মান পেতেন, দেশে ফিরলেই যেন অন্য এক জগতে পা রাখতেন—চারদিকে শুধু প্রশ্ন আর অবিশ্বাস।

ফেরার গল্প, আর একটা অলৌকিক অধ্যায়
২০১৬ সালের বিদায়ের পর বেশিদিন যায়নি। নতুন কোচ এদগার্দো বাউজা সরাসরি বার্সেলোনায় গিয়ে হাজির হন মেসির কাছে, অনুরোধ করেন সিদ্ধান্ত পাল্টানোর জন্য। দেশের মানুষের কাছ থেকেও আসতে থাকে একই আকুতি। শেষমেশ ভালোবাসার কাছেই হার মানেন মেসি, ফিরে আসেন মাঠে।

কিন্তু ফেরাটা রাতারাতি সাফল্য বয়ে আনেনি। ২০১৮ বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকেই বিদায়, অনেকে তখন ভেবেই নিয়েছিলেন—মেসির হাতে বিশ্বকাপ আর উঠবে না।

তারপর এলো সেই মোড়। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছরের প্রতীক্ষার অবসান। এরপরের তিন বছরে যেন বাঁধ ভেঙে গেল—ফিনালিসিমা, আর সবশেষে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি, পরিবারের সামনেই যা তুলে ধরলেন মেসি। যে স্বপ্নটা একসময় অধরা মনে হতো, সেটাই সত্যি হয়ে উঠল চোখের সামনে।

স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো পরে বলেছিলেন, তাদের সন্তানরা খুব কাছ থেকে দেখেছে বাবার এই দীর্ঘ লড়াই—কীভাবে বারবার হোঁচট খেয়েও হাল ছাড়েননি মেসি, বিশ্বাস হারাননি নিজের ওপর।

শেষ বিশ্বকাপ, শেষ লড়াই
৩৯ বছর বয়সে ২০২৬ বিশ্বকাপে ষষ্ঠবারের মতো মাঠে নামলেন মেসি। আগের মতো গতি নেই, মাঝেমধ্যে হাঁটার গতিতেই চলছিলেন মাঠে। কিন্তু বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতায় খামতি ছিল না—আটটি গোল, চারটি অ্যাসিস্ট নিয়ে দলকে ফাইনালে তুললেন। শেষমেশ স্পেনের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হলো—আর কাকতালীয়ভাবে সেই ফাইনালটাও হলো সেই একই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে, যেখানে ঠিক এক দশক আগে প্রথমবার বিদায় বলেছিলেন তিনি। বৃত্তটা যেন এক জায়গায় এসে সম্পূর্ণ হলো।

অপ্রিয় থেকে দেবতা: বদলে যাওয়ার হিসাব
মেসি নিজেই স্বীকার করেছেন, একটা সময় নিজের দেশে তাকে নিয়ে যে সমালোচনা হতো, তার আঁচ লেগেছিল পরিবার আর কাছের মানুষদের গায়েও। কিন্তু বিশ্বকাপ আর কোপা আমেরিকা জেতার পর সেই চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। আজ দেশের প্রায় সবটুকু মানুষের ভালোবাসা জিতে নেওয়াকেই তিনি নিজের সবচেয়ে বড় অর্জনের একটি মনে করেন।
মজার ব্যাপার হলো, যে সমালোচনা একসময় তাকে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, সেই একই তীব্র আবেগ সময়ের সঙ্গে রূপ নিয়েছে গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়। কারণটাও সহজ—মানুষ কড়া সমালোচনা তখনই করে, যখন প্রত্যাশাটা থাকে আকাশছোঁয়া।

১৯ থেকে ১০: একটা জার্সির অভিযাত্রা
বিশ্বকাপ অভিষেকে মেসির গায়ে ছিল ১৯ নম্বর জার্সি—তখনও তিনি পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার গল্পেই বেশি জড়িয়ে। ২০১৪ থেকে ১০ নম্বর জার্সি গায়ে শুরু হয় তার আসল উত্থান। আর সেই ১০ নম্বরের সঙ্গেই শেষমেশ জুড়ে গেল দুটো গোল্ডেন বল, একটা বিশ্বকাপ শিরোপা, আর ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরাদের তালিকায় স্থায়ী একটা আসন।

রোজারিওর সেই লাজুক ছেলেটা, যাকে নিয়ে একসময় প্রশ্ন উঠেছিল—সেই একই ছেলে আজ পুরো একটা জাতির কাছে হয়ে উঠেছে চিরস্থায়ী গর্বের প্রতীক।

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *