বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশু নিখোঁজের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। হঠাৎ করে দেশে এমন শিশু নিখোঁজের খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। তাই যাদের ঘরে শিশু বাচ্চা আছে তাদের কিছু বিষয়ে আগে থেকে জানা থাকা ভালো। আর যদি কারো শিশু নিখোঁজ হয় তাহলে প্যানিক না হয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে খোঁজ করলে অনেক সময় বড় বিপদ এড়ানো যায়।

বাংলাদেশের পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ে নিখোঁজ হয়েছে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু। ২ হাজার ৩৮ জনের খোঁজ মেলেনি। তবে এটি আসলে জিডির সংখ্যা।

নিখোঁজ মানেই অপহরণ নয়। কিন্তু যে শিশুরা অপরাধের মুখে পড়ে, তাদের জন্য সময়ই একমাত্র সুযোগ।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের গবেষকেরা ১৯৬৮ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে ঘটা শিশু-অপহরণের পর খুনের শতাধিক মামলা বিশ্লেষণ করেছিলেন। এতে দেখা যায়, খুন হওয়া শিশুদের ৭৬ শতাংশ অপহরণের তিন ঘণ্টার মধ্যে এবং প্রায় ৮৯ শতাংশ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা গিয়েছিল।

গবেষণার দেখা যায়, অর্ধেকেরও বেশি অপহরণ ঘটেছিল শিশুর বাড়ি থেকে তিন ব্লকের মধ্যে। তাই কাছের এলাকা মানেই নিরাপদ নয়।

দ্বিতীয়ত, যেসব মামলায় শিশুকে জীবিত পাওয়া যায়নি, এমনক্ষেত্রে ৬০ শতাংশে শিশুকে নিখোঁজ বলে বোঝার পর পুলিশকে জানাতে দুই ঘণ্টার বেশি দেরি হয়েছিল।

দেরি না করে আশপাশে খুঁজুন
একজন একা সব সামলাতে পারে না। ভয়ের মুহূর্তে একে অপরকে দোষ দিলে সময় চলে যায়। তাই খোঁজার কাজ ভাগ করে নিন।
একজন ফোন ধরবেন। ৯৯৯-এ কল করুন এবং থানায় যান। পাশাপাশি সিআইডির হটলাইন ১৩২১৯-এ জানান বা munalert.org-এ রিপোর্ট করুন।

এর একটা বাড়তি কারণ আছে। মুন অ্যালার্ট এখন ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে শিশুটি যে এলাকায় হারিয়েছে, সেখানকার মানুষের ফোনে সরাসরি বিজ্ঞপ্তি পাঠাতে পারে।

আপনার নিজের পোস্ট বন্ধু-তালিকার বাইরে সহজে যায় না, কিন্তু এই বিজ্ঞপ্তি অচেনা পথচারীর ফোনেও পৌঁছায়।
থানায় কেউ যদি বলে চব্বিশ ঘণ্টা পর আসুন, সেটা আইনের শর্ত নয়, ভুল ধারণা। তবু ভুক্তভোগী পরিবার ও জিরো মিসিং ফাউন্ডেশনের অভিযোগ, বাস্তবে কোথাও কোথাও জিডি নিতে গড়িমসি হয়। সে ক্ষেত্রে ৯৯৯ এবং ১৩২১৯-এ একই সঙ্গে জানিয়ে রাখুন।

শিশু-সুরক্ষা বা পাচারের আশঙ্কায় পরামর্শ চাইতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ আছে, যা ২৪ ঘণ্টা খোলা।
কয়েকজন খুঁজবেন, দিক ভাগ করে। একই গলি তিনজন না দেখে প্রত্যেকে আলাদা পথ ধরুন। মাইকে ঘোষণা দিন।

একজন তথ্য গুছিয়ে রাখবেন। পুলিশ জিজ্ঞেস করবে শেষবার কখন, কোথায়, কার সঙ্গে দেখা গেছে এবং গায়ে কী ছিল।

একটি পরিষ্কার সাম্প্রতিক ছবি, উচ্চতা, গায়ের রং, জন্মদাগ, জুতার রং লিখে রাখুন। শিশুর ফোন থাকলে কল-মেসেজ মুছবেন না।

শিশুর ব্যবহৃত টুথব্রাশ বা চিরুনির মতো জিনিস ধুয়ে ফেলবেন না। তদন্তকারীদের কাজে লাগতে পারে।

একজন সিসিটিভির দায়িত্ব নেবেন। দোকান, স্কুল, মসজিদ বা বাসার ক্যামেরার ফুটেজ কয়েক দিনেই নিজে থেকে মুছে যায় বলে আগেভাগে সংরক্ষণ করতে বলুন।

একজন বাড়িতে থাকবেন। শিশু নিজে ফিরলে যেন কেউ থাকে, আর ফোনটা যেন ধরা যায়।

বাইরে ছোটার আগে ঘরটা আরেকবার খুঁজুন
ছোট শিশুরা ভয় পেয়ে বা খেলার ছলে এমন জায়গায় লুকায়, যা বড়দের কল্পনায় আসে না।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিখোঁজ ও নির্যাতিত শিশু কেন্দ্র (এনসিএমইসি) বলছে, বাইরে বেরোনোর আগে ঘরের আলমারি, কাপড়ের স্তূপ, খাটের নিচ ও বড় যন্ত্রপাতির ভেতরটা ভালো করে দেখে নিতে। পানির ড্রাম, ডোবা ও নির্মাণাধীন ভবনও প্রথম দফাতেই দেখুন।

অটিজম থাকলে আগে জলাশয়
শিশুর অটিজম বা বিকাশজনিত বিশেষ চাহিদা থাকলে খোঁজের ক্রম পাল্টে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অটিজম অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১১ সালে অটিজমে আক্রান্ত ১৪ বছরের কম বয়সী যেসব শিশু বেরিয়ে গিয়ে মারা গিয়েছিল, তাদের ৯১ শতাংশের মৃত্যু হয়েছিল পানিতে ডুবে। এ কারণেই উদ্ধারকারীদের নির্দেশনা হলো আগে পানি খুঁজুন। এসব শিশু অনেক সময় ডাকলে সাড়া দেয় না, এমনকি খোঁজা দলকে এড়িয়ে ছোট জায়গায় লুকিয়ে থাকে। তাই সাধারণ ডাকাডাকির বাইরে শিশুর প্রিয় জায়গা, প্রিয় শব্দ বা প্রিয় গান কাজে লাগান।

স্কুলপড়ুয়া বা কিশোর-কিশোরীর ক্ষেত্রে আগে বন্ধু ও প্রিয় আত্মীয়ের বাড়ি দেখুন।

পুলিশ বলছে অভিমান, পড়ার চাপ ও পারিবারিক অশান্তিও অনেক সময় কারণ। বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, হাসপাতালেও খবর নিন।

পুলিশ কোনো হারানো শিশুকে পেলে আদালতের মাধ্যমে অনেক সময় শিশু সদনে পাঠায়, তাই আদালতের নন-এফআইআর শাখায় খোঁজ নেওয়াও জরুরি।

মুন অ্যালার্ট
মুন অ্যালার্ট-মেটা অংশীদারি চালুর পর প্রথম সফল উদ্ধারটি ঘটে ঢাকার মিরপুরে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নয় বছরের এক ছেলেকে ফেসবুক বিজ্ঞপ্তি দেখে চিনে ফেলেন একটি ফার্মেসির কর্মী। সে বিজ্ঞপ্তি এসেছিল ঘটনার এক ঘণ্টার মধ্যে। শিক্ষা একটাই: আপনার ফোনে এমন বিজ্ঞপ্তি এলে ছবিটা ভালো করে দেখুন। আপনি হয়তো সেই এলাকাতেই আছেন।

ফেসবুক
স্থানীয় গ্রুপে ছবি ও বর্ণনা দিলে খবর দ্রুত ছড়ায়। কিন্তু পূর্ণ ঠিকানা, জন্মনিবন্ধন নম্বর বা পরিবারের ব্যক্তিগত নম্বর দেবেন না। যোগাযোগের নম্বর হিসেবে পুলিশের বা বিশ্বস্ত স্বজনের নম্বর দিন। শিশুকে পাওয়া গেলে পোস্ট মুছে দিন বা হালনাগাদ করুন, নইলে পুরনো ছবি বছরের পর বছর ঘুরতে থাকে।

শিশুকে আগে থেকে যা শেখানো যায়
অপরিচিতের সঙ্গে যেয়ো না শেখানো যথেষ্ট নয়। ওয়াশিংটনের গবেষণাতেই দেখা গেছে, খুনের ঘটনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী ছিল অপরিচিত, বাকিরা কোনো না কোনোভাবে চেনা।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় বাংলাদেশেও পরিচিতদের আটক করা হয়েছে। তাই সংকেতটা চেনা-অচেনার নয়। যে-ই বলুক মা-বাবাকে বোলো না বা চলো একটা সারপ্রাইজ দেখাই, সেটাই বিপদের লক্ষণ।

অন্তত একটি ফোন নম্বর মুখস্থ করানো
পরিবারের একটি গোপন কোড-শব্দ ঠিক করা। কেউ বাবা পাঠিয়েছে বললে শিশু শব্দটা চাইবে, না জানলে যাবে না।

হারালে কার কাছে সাহায্য চাইতে হবে তা শেখানো। যেমন সন্তানসহ কোনো মহিলা, দোকানদার বা ইউনিফর্ম পরা নিরাপত্তাকর্মী।
ভিড়ের জায়গায় হারিয়ে গেলে যেখানে আছে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে বলা।

ছোট শিশুর ব্যাগ বা পকেটে ফোন নম্বর লেখা ট্যাগ রাখা।
ভিড়ের বাজারে ছোট শিশুকে একা অন্যের হাতে ছেড়ে না দেওয়া, তিনি ঘরের সহকারী বা আত্মীয় যে-ই হোন।

নিখোঁজ শিশুদের বেশিরভাগই ফিরে আসে। কিন্তু যে ঘণ্টাগুলোতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সেগুলোর হিসাব আগে থেকে জানা থাকা দরকার।

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *