
ভোর হলে আকাশে সূর্য ওঠে। সে আলো গিয়ে পড়ে কারখানার টিনের চালে, বহুতল ভবনের ছাদে, স্কুলের খোলা টেরেসে। এতকাল এসব ছাদ শুধু রোদে পুড়েছে। এখন সেই রোদই হয়ে উঠতে পারে বিদ্যুৎ।
বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, আর জ্বালানি আমদানির বিলও ভারী হচ্ছে। দুই দিক থেকেই চাপ। এই চাপের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ আর কেবল সবুজ বিকল্পের গল্প নয়, এটি খরচ কমানোর একটি নতুন পথও। আর সেই পথের ওপারে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল প্রতিবেশী: চীনের সোলার অর্থনীতি। প্যানেল, সেল, ওয়েফার থেকে ব্যাটারি পর্যন্ত বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থার চাবি এখন তাদের হাতে।
২০২৪ সালে চীন একাই যোগ করেছে রেকর্ড ২৭৭ গিগাওয়াট সৌরক্ষমতা (আইআরইএনএ)। সেখানে বড় প্রকল্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় খরচ প্রায় ৩.৩ মার্কিন সেন্ট, যেখানে বিশ্বের গড় ৪.৩ সেন্ট।
আইইএর ২০২২ সালের বিশ্লেষণে দেখা যায়, পলিসিলিকন থেকে মডিউল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বিশ্বের উৎপাদন সক্ষমতার ৮০ শতাংশের বেশি চীনে। ২০১১ সাল থেকে সেখানে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়েছে, আর তৈরি হয়েছে তিন লাখের বেশি কর্মসংস্থান।
এ যেন এক বিশাল অ্যাসেম্বলি লাইন, যার এক মাথায় কাঁচামাল ঢোকে, অন্য মাথায় বেরিয়ে আসে তৈরি প্যানেল। একই ছাদের নিচে সব হলে পরিবহন আর সংগ্রহের খরচ কমে। উৎপাদন যত বাড়ে, প্রতিটি পণ্যের দাম তত নামে।
একসময় সৌরবিদ্যুৎ বসানো ছিল ধনীর শখ, আজ সেই দেয়াল ভাঙছে। কিন্তু এখানে একটা ফাঁদও আছে। চীনের কারখানায় দাম কম মানেই আপনার দোকানে দাম কম, তা নয়। জাহাজভাড়া, শুল্ক, ঋণের সুদ, বসানোর খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ আর ডলারের বিনিময় হার, এই পথ পেরিয়ে তবেই প্যানেল পৌঁছায় ছাদে।
এই ঘনবসতির দেশে বিশাল সৌরখামারের জন্য জমি খোঁজা সহজ নয়। কিন্তু জমি না পেলে কী, আকাশের দিকে মুখ করা ছাদ তো অগণিত। তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ—এই কারখানাগুলোর বিদ্যুতের খিদে বিশাল, আবার ছাদও বিশাল।
নিজের ছাদে নিজের বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে গ্রিডের ওপর ভর কমে, দীর্ঘ মেয়াদে খরচও সীমিত থাকে। তবে হিসাব মেলানোর শর্ত আছে—বসানোর খরচ, দিনের বেলার ব্যবহার, ঋণের সুদ, সিস্টেমের কার্যক্ষমতা আর রক্ষণাবেক্ষণ।
২০২৫ সালের আগস্টে নেট মিটারিং নির্দেশিকা হালনাগাদ হয়েছে। এখন ছাদের মালিক বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করতে পারবেন।
স্রেডার তথ্যমতে, ছয়টি বিতরণ সংস্থার নেটওয়ার্কে ৪ হাজার ৪৯০টিরও বেশি নেট-মিটারড ছাদ-ব্যবস্থা জুড়েছে, মোট সক্ষমতা প্রায় ২১৪ মেগাওয়াট। তবে সত্য কথাটা হলো, দেশের মোট চাহিদার সামনে এ সংখ্যা এখনো নগন্য।
তাই অগ্রগতি মাপতে শুধু ‘কত বসেছে’ দেখলে চলবে না। দেখতে হবে কত বিদ্যুৎ সত্যিই উৎপাদিত হলো, কত গ্রিডে গেল, কত বিনিয়োগ এল।
২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি (আইইএর তথ্য অনুযায়ী) লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট চাহিদার ২০ শতাংশ, ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ আসবে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। সঙ্গে আছে বিনিয়োগে প্রণোদনা, আমদানিতে সুবিধা, আর ব্যাটারি-সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি।
কিন্তু নীতির কাগজ আর মাঠের মাটির মাঝখানে একটা খাদ থাকে। সেই খাদে সেতু বানাতে চাই বিনিয়োগকারীর জন্য সহজ অনুমোদন, শক্তিশালী বিতরণব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, আর নেট মিটারিং, দাম ও গ্রিড সংযোগ নিয়ে গ্রাহকের কাছে স্বচ্ছ তথ্য।
বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র একা এ লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে না। ছাদের প্যানেল, কারখানার নিজস্ব উৎপাদন আর গ্রিডের সুর মিলিয়ে চললে তবেই সংরক্ষণব্যবস্থা অপরিহার্য হবে, আর সেখানে চীনের প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি কাজে আসতে পারে।
এবার আসি আসল প্রশ্নে। আমরা কি চিরকাল শুধু দোকানের ক্রেতা হয়ে থাকব, নাকি ধীরে ধীরে কারিগর হব? একটি সৌর প্রকল্প মানে শুধু প্যানেল নয়। লাগে ইনভার্টার, কেবল, মাউন্টিং কাঠামো, সুরক্ষা সরঞ্জাম, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, আর সবচেয়ে বড় কথা, দক্ষ মানুষ। এর কোনটি দেশে তৈরি সম্ভব, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বাজারের আকার, উৎপাদন ব্যয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আর মান নিয়ন্ত্রণের বাস্তব হিসাব কষে।
পথটা হতে পারে এমন— শুরুতে আমদানি করা পণ্যে বাজার বড় করা, পরে চাহিদা ও সম্ভাব্যতা দেখে সংযোজন, যন্ত্রাংশ আর উৎপাদনের দিকে এগোনো।
চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ এতে সাহায্য করতে পারে, তৈরি হতে পারে প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানের নতুন প্রজন্ম।
তবে মনে রাখতে হবে, যৌথ উদ্যোগ মানেই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি হস্তান্তর নয়। চুক্তিতে স্পষ্ট থাকতে হবে স্থানীয় উপাদানের ব্যবহার, কর্মী প্রশিক্ষণ আর গবেষণায় বিনিয়োগ।
সূর্য প্রতিদিন ওঠে, কারও অনুমতি ছাড়াই, বিনা মূল্যে। চীন সেই আলোকে সস্তা প্রযুক্তিতে রূপ দিয়েছে। বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ, সে প্রযুক্তিকে শুধু কিনে আনার নয়, নিজের মাটিতে শেকড় গাড়ানোর।
সাশ্রয়ী ব্যবহার, দেশীয় দক্ষতা, বিনিয়োগ আকর্ষণ আর সরবরাহ-ঝুঁকি কমানো, এই চার সুতোয় বুনলে চীনের সৌরশিল্প হয়ে উঠতে পারে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পের প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা আর সবুজ অর্থনীতির শক্ত ভিত।













