আপনি কি প্রায়ই রাত ২টো বা ৩টেয় হঠাৎ জেগে ওঠেন? ভাবছেন, আপনার কি অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়া হল? মন খারাপ করবেন না! গবেষকরা বলছেন, হয়তো আপনি অসুস্থ নন— আপনি ফিরে যাচ্ছেন আপনার হাজার বছরের পুরোনো এক ‘রাজকীয়’ অভ্যাসে।

বিশ্বাস না হলেও সত্যি, রাতে একটানা যে ৮ ঘণ্টা ঘুমের চেষ্টা আমরা করি, তা সভ্যতার নিরিখে খুব নতুন। মানব ইতিহাসের দীর্ঘ অধ্যায়ে, মানুষ রাতে দু’দফায় ঘুমাতেন, যার নাম ‘বাইফেজিক স্লিপ’ (Biphasic Sleep) বা দ্বি-নিদ্রা।

আসুন, ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখে নিই, কেন এই অভ্যাস হারিয়ে গেল এবং এই ‘হারানো ঘুম’ আমাদের আজকের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে।

১. একসময় রাতে দু’দফা ঘুমই ছিল স্বাভাবিক নিয়ম

ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা— সর্বত্র সহস্র বছর আগে মানুষ এই দ্বি-নিদ্রায় অভ্যস্ত ছিল। এটি ছিল রাতের জীবনযাপনের এক স্বাভাবিক ছন্দ।

  • প্রথম ঘুম (First Sleep): সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পরই প্রথম ঘুম শুরু হতো, যা চলত গভীর রাত পর্যন্ত।
  • মধ্যরাতের বিরতি (The Waking Period): এরপর মাঝরাতে সবাই উঠে পড়তেন। এই বিরতি চলত এক থেকে দেড় ঘণ্টা।
  • দ্বিতীয় ঘুম (Second Sleep): তারপর আবার ঘুমোতে যেতেন এবং ভোরবেলা ঘুম ভাঙত।

এই বিরতি মোটেও অসুস্থতা বা অনিদ্রার ফল ছিল না, বরং তা ছিল দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অংশ।

woman sleeping
Photo by Ivan Oboleninov on Pexels.com

২. মধ্যরাতের বিরতি: অন্ধকার রাতে মানুষ তখন কী করত?

আলোবিহীন সেই যুগে মধ্যরাতের এই বিরতি ছিল এক অদ্ভুত অবকাশ। একে আপনি রাতের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক টুকরো ‘ছোট্ট দিন’ বলতে পারেন!

ইতিহাসবিদরা জানাচ্ছেন, এই সময় মানুষজন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং মজার কাজ সারতেন:

  • দৈনন্দিন কাজ: শীতের দেশগুলিতে আগুন জিইয়ে রাখতে কাঠ দেওয়া বা খামারের পশুদের একবার দেখে আসা।
  • আধ্যাত্মিকতা: অনেকে উঠে শান্ত মনে প্রার্থনা করতেন বা ধর্মগ্রন্থ পড়তেন।
  • সৃজনশীলতা: এই সময় ডায়েরি বা চিঠি লেখার চল ছিল খুব বেশি— কারণ দিনের বেলায় কাজের চাপ থাকত।
  • রোম্যান্স ও আলাপন: অনেক দম্পতি এই সময়টুকু নিজেদের একান্ত আলাপন বা ভালোবাসার গভীর মুহূর্তের জন্য বরাদ্দ রাখতেন। গ্রিক কবি হোমার থেকে শুরু করে প্রাচীন লেখকদের রচনায় এর উল্লেখ রয়েছে।

আসলে, মধ্যরাতের এই অবকাশ ছিল মানুষের মন ও মস্তিষ্কের জন্য এক নীরব ‘Self-Care’ বা আত্ম-যত্নের সময়।

৩. ঘুমের ছন্দপতন ঘটালো কে? আলো নাকি সভ্যতা?

এই প্রাচীন নিয়মের বদল ঘটল যখন আধুনিক জীবন তার থাবা বসাতে শুরু করল। কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডারেন রোডস মনে করেন, গত ২০০ বছরে সামাজিক পটবদলই মূলত আমাদের একটানা ঘুমানোর অভ্যাস শিখিয়েছে।

বিপ্লবটি এলো আলোর হাত ধরে:

  1. কৃত্রিম আলোর আগমন: সপ্তদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে প্রথমে তেলের আলো, তারপর গ্যাসের আলো, এবং চূড়ান্তভাবে বিদ্যুতের ঝলকানি এলো। এর ফলে রাতের অন্ধকার আর ‘বিশ্রামের সংকেত’ রইল না।
  2. কাজের সময়ের বাড়বৃদ্ধি: কৃত্রিম আলো মানুষের কাজের সময়কে টেনে নিয়ে গেল রাতের গভীরে। যেহেতু রাতেও কাজ করা সম্ভব হলো, তাই সূর্যাস্তের পরপরই ঘুমিয়ে পড়ার তাড়া আর থাকল না।
  3. শিল্পবিপ্লবের ধাক্কা: শিল্পবিপ্লব (Industrial Revolution) এই পরিবর্তনে দ্রুত গতি আনলো। কারখানায় কঠিন পরিশ্রমের পর মানুষ এমনভাবে ক্লান্ত হতো যে, বিছানায় গিয়ে একটানা ঘুমিয়ে পড়াই ছিল একমাত্র পথ। মধ্যরাতের সেই ফুরসতটুকু নেওয়ার মতো শারীরিক বা মানসিক অবকাশ আর রইল না।
close up photography of woman sleeping
Photo by Andrea Piacquadio on Pexels.com

৪. বিজ্ঞান কী বলছে: মেলাটোনিন এবং উজ্জ্বল আলোর ভূমিকা

এই সামাজিক পরিবর্তন আমাদের দেহের ভেতরের রসায়নকেও বদলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, উজ্জ্বল আলো আমাদের ঘুমের চক্রকে নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ‘মেলাটোনিন’-এর ক্ষরণকে দেরি করিয়ে দেয়।

  • ঘরে যত উজ্জ্বল আলো জ্বলে, মেলাটোনিন হরমোন তত দেরিতে কার্যকর হয়।
  • ফলে, ঘুমের আহ্বান পিছিয়ে যায় এবং আমরা রাতে বেশি সময় জেগে থাকি।

আসলে, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়াটা হয়তো আমাদের মস্তিষ্কের সেই বহু পুরোনো, শান্ত অভ্যাসেরই এক ক্ষীণ স্মৃতি। এখন যখন আপনার ঘুম ভাঙে, তখন হয়তো আপনার প্রাচীন মস্তিষ্ক আপনাকে ফিসফিস করে মনে করিয়ে দিচ্ছে— “ওঠো, একটু ডায়েরি লেখো বা ভালোবাসার কথা বলো!”


আজকের একটানা ঘুম হয়তো সময়ের দাবি, কিন্তু এটি আমাদের মস্তিষ্ককে প্রকৃতির সেই শান্ত ছন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আপনার যদি মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়, তবে দুশ্চিন্তা না করে শান্ত থাকুন। এই অভ্যাস হয়তো আপনার পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া এক মূল্যবান উত্তরাধিকার!

Tags:

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *