
আকাশজুড়ে যখন বারুদের গন্ধ আর সীমান্তের ওপাড়ে যুদ্ধের দামামা, তখন পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি এক আশ্চর্য নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত ইরান। অথচ অদ্ভুত এক সমীকরণে, তথাকথিত ‘মুসলিম উম্মাহ’র বিশাল মানচিত্রে ইরান আজ এক নিঃসঙ্গ দ্বীপ। কেন ভ্রাতৃত্বের স্লোগানগুলো আজ মরুভূমির বালিতে বিলীন? কেন আরবের মিনারগুলো থেকে তেহরানের জন্য কোনো অভয়বাণী ভেসে আসছে না?
১. ভ্রাতৃত্বের মরীচিকা ও স্বার্থের কঠিন দেয়াল
‘প্যান-ইসলামিক’ বা বৃহত্তর মুসলিম সংহতির কথাটি বইয়ের পাতায় যতটা উজ্জ্বল, বাস্তব রাজনীতির রুক্ষ জমিতে তা ততটাই ধূসর। ইরান আজ আক্রান্ত, কিন্তু প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোর চোখে সহমর্মিতার বদলে ফুটে উঠছে এক গভীর সতর্কতা। কোনো কোনো দেশ তেহরানকে সাহায্য করার চেয়ে বরং একে একটি ‘আঞ্চলিক হুমকি’ হিসেবেই দেখছে। জাতীয় নিরাপত্তা আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বার্থে তারা আজ সংহতির চেয়ে বিচ্ছেদকেই শ্রেয় মনে করছে।
২. সুন্নি-শিয়া: ইতিহাসের সেই রক্তক্ষরণ
৬৩২ খ্রিস্টাব্দের সেই উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিবাদ আজ ২০২৬ সালের ভূ-রাজনীতিতেও এক অমোঘ দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিয়া প্রধান ইরান আর সুন্নি প্রধান আরব বিশ্বের মধ্যে কয়েক দশকের যে ‘স্নায়ুযুদ্ধ’, তা যুদ্ধের ময়দানে ইরানের একাকীত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশেষজ্ঞ ফ্যাব্রিস ব্যালানশের ভাষায়, “শিয়াদের জন্য সুন্নিদের হৃদয়ে সংহতির জায়গা সংকীর্ণ, বিশেষ করে যখন সেই শিয়া শক্তি প্রতিবেশী সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর স্থিতিশীলতাকে কাঁপিয়ে দেয়।”
৩. পবিত্র মাসে অপবিত্র দহন: এক কৌশলগত ভুল
রমজান মানেই শান্তির শুভ্রতা। অথচ এই পবিত্র মাসেই যখন ইরান প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়, তখন তা কেবল সামরিক নয়, বরং এক বিরাট নৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা দেয়। ইসলামি সংহতির স্বঘোষিত ‘রক্ষক’ তেহরান নিজেই আজ তার প্রতিবেশীদের শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইয়াসমিনা আসরাগিস ঠিকই বলেছেন, পবিত্র মাসে এই তপ্ত লড়াই ইরানের জন্য এক অপূরণীয় কৌশলগত ভুল।
৪. আধুনিক আরবের ‘ভিশন’ বনাম ইরানের ‘বিপ্লব’
আরব বিশ্ব আজ বদলে গেছে। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের চোখে এখন ‘ভিশন ২০৩০’-এর স্বপ্ন—যেখানে ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর গোল আর পর্যটনের জোয়ার বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারা আর ১৯৭৯ সালের কোনো পুরনো বিপ্লবের আগুনে পুড়তে রাজি নয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন আদর্শিক গোঁড়ামি ছেড়ে উন্নয়নের বাস্তবতায় বিশ্বাসী। ফলে তারা ইরানের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে বরং ইসরায়েলের ‘আয়রণ ডোম’ প্রযুক্তির ছায়াতলে নিজেকে নিরাপদ মনে করছে।
৫. ভেঙে পড়া ‘প্রতিরোধের অক্ষ’
দীর্ঘদিন ধরে ইরান লেবানন, সিরিয়া আর ইয়েমেনে যে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ গড়ে তুলেছিল, তা আজ তাসের ঘরের মতো লণ্ডভণ্ড। হেজবুল্লাহর নেতৃত্ব আজ ছিন্নভিন্ন, হামাস পঙ্গু, আর সিরিয়ার পুরনো বন্ধু বাশার আল-আসাদ এখন ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য। যে শক্তিগুলো ইরানের হাত হয়ে লড়াই করত, তারা আজ নিজেরাই অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে।
৬. আব্রাহাম অ্যাকর্ডস: শত্রু যখন মিত্রের ছায়াসঙ্গী
২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ আমূল বদলে দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত বা বাহরাইনের কাছে ইরান এখন যতটা না ‘মুসলিম ভাই’, তার চেয়ে বেশি ‘অভিন্ন শত্রু’। এই নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থায় ইসরায়েল আজ আর অস্পৃশ্য নয়, বরং ইরানের আগ্রাসন ঠেকানোর এক বিশ্বস্ত অংশীদার।
ইতিহাস সাক্ষী, ইরান একসময় মধ্যপ্রাচ্যের ‘নিয়ন্ত্রক’ ছিল। কিন্তু আজ সেই দাপট কেবলি স্মৃতি। যুদ্ধের ধোঁয়া যখন কুয়াশার মতো মিলিয়ে যাবে, তখন হয়তো ইরান টিকে থাকবে, কিন্তু তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে তাকে পাড়ি দিতে হবে যুগের পর যুগ। কারণ, অস্ত্রের ক্ষত শুকায়, কিন্তু আস্থার অপমৃত্যু সহজে মোছে না।
লেখা : বিবিসি অবলম্বনে
























