গত কয়েক দশকে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও বেড়েছে খাদ্যশস্যের উৎপাদন। কিন্তু সেই সঙ্গে নীরবে কমেছে ফসলের পুষ্টিগুণ। গবেষণায় দেখা গেছে, চাল, গম ও সবজিতে জিংক, আয়রন ও প্রোটিনের মতো জরুরি অণুপুষ্টির ঘনত্ব ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে পর্যাপ্ত খাবার খেয়েও কোটি কোটি মানুষ ভুগছে প্রচ্ছন্ন ক্ষুধা বা অদৃশ্য অপুষ্টিতে। বাংলাদেশের মতো ভাতনির্ভর দেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে প্রধান খাদ্য চাল, আর সেই চালের পুষ্টিমানই এখন প্রশ্নের মুখে।

এই উদ্বেগের সর্বশেষ প্রমাণ মিলেছে যুক্তরাজ্যের অলাভজনক বিজ্ঞান সংস্থা ডিপ সায়েন্স ভেঞ্চারস (ডিএসভি) ও মার্ক লিওনার্ড ট্রাস্টের যৌথ প্রতিবেদনে। ২০২৬ সালের অক্টোবরের শুরুতে প্রকাশিত ‘হলো হারভেস্ট: রিবিল্ডিং দ্য নিউট্রিশনাল ভ্যালু অব ক্রপস ইন অ্যান এজ অব আবান্ড্যান্ট ক্যালোরিজ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনের বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘ফাঁপা ফসল: প্রচুর ক্যালোরির যুগে ফসলের পুষ্টিমান পুনর্গঠন’।

এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আরও গবেষণা রয়েছে। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০২৬ সালের এক মেটা-অ্যানালাইসিসে ৪৩টি খাদ্যশস্যের প্রায় ৬০ হাজার পুষ্টিগত পরিমাপ বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাড়ায় উদ্ভিদে শর্করা ও ক্যালোরি বাড়ছে, কিন্তু প্রোটিন, জিংক ও আয়রনের মতো খনিজ গড়ে ৩.২ শতাংশ কমছে। কিছু ফসলে জিংক কমার হার ৩৭.৫ শতাংশ পর্যন্ত।

আরও আগে, ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ডোনাল্ড ডেভিস ও তার দল ইউএসডিএর দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন, ১৯৫০ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে ৪৩টি ফসলে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ভিটামিন সি ও প্রোটিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

আন্তর্জাতিক পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ১৯৬০-পরবর্তী সময়ে উদ্ভাবিত রুটির গমের তিন-চতুর্থাংশেরও কম জাত জিংকের ন্যূনতম আদর্শ মাত্রা পূরণ করতে পারছে। ষাট বছর আগের তুলনায় এখনকার গাজরে পটাশিয়ামও প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ একই পুষ্টি পেতে এখন দ্বিগুণ গাজর খেতে হয়।

এই পতনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। কৃষিবিজ্ঞানীরা যাকে ডিলিউশন ইফেক্ট বা পাতলা হওয়ার প্রভাব বলছেন, তাতে উচ্চ ফলনশীল জাতে শস্যের আকার ও ফলন বাড়লেও পুষ্টির ঘনত্ব সেই অনুপাতে বাড়ে না, বরং কমে যায়। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়ায় উদ্ভিদে শর্করা বেশি তৈরি হচ্ছে, অথচ খনিজের ঘনত্ব কমছে।

রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার ও নিবিড় চাষে মাটির গভীরের মাইকোরাইজাল ছত্রাক ও উপকারী অণুজীবের নেটওয়ার্কও নষ্ট হচ্ছে।

মৃত্তিকা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, এই অণুজীবগুলো উদ্ভিদের শিকড়কে মাটি থেকে খনিজ শোষণে সরাসরি সাহায্য করে; এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফসল প্রয়োজনীয় খনিজ পায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিমাণকেন্দ্রিক কৃষিনীতি। বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত কয়েক দশকে গুণের চেয়ে পরিমাণের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে, যার ফল বেশি উৎপাদন কিন্তু কম পুষ্টি।

বাংলাদেশে এই সংকটের ছাপ মাটি থেকে মানুষ, দুই জায়গাতেই স্পষ্ট। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিবিড় চাষের কারণে দেশের প্রায় ৭৬.২ শতাংশ আবাদি জমি মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। সংস্থাটির মৃত্তিকা পুষ্টি মানচিত্র বলছে, অর্ধেকেরও বেশি ফসলি জমিতে জৈব উপাদান আদর্শ মাত্রার চেয়ে কমে ১ থেকে ১.৫ শতাংশের নিচে নেমেছে এবং প্রায় সাড়ে ৫ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে দস্তা (জিঙ্ক), বোরন ও সালফারের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের শরীরে।

জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সার্ভের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ শিশু এবং ৫৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী জিংকের ঘাটতিতে ভুগছেন, অথচ প্রতিদিন যথেষ্ট পরিমাণে ভাত খাওয়া হচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ ফলনশীল সাদা চালের পুষ্টিঘনত্ব কমে যাওয়া এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসের অভাব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং সাব-সাহারা আফ্রিকায় গর্ভবতী নারী ও শিশুদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা, হাড় ক্ষয় ও নানা দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টিজনিত রোগ বাড়ছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় স্বাস্থ্য খাতেও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

তবে সমাধানের পথও একেবারে বন্ধ নয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ইতিমধ্যে ব্রি ধান-৭৪ ও ব্রি ধান-১০০-এর মতো জিংকসমৃদ্ধ বায়োফর্টিফাইড জাত উদ্ভাবন করেছে, যা দৈনিক জিংক চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করতে সক্ষম।

গবেষকেরা এখন জিংক ও আয়রন, দুটিরই সুবিধাযুক্ত আরও উন্নত জাত তৈরিতে কাজ করছেন, যা থেকে শরীরের অন্তত ৮০ শতাংশ জিংক ও ৫০ শতাংশ আয়রনের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। কিন্তু ভোক্তার অভ্যাস না বদলালে এর পুরো সুফল মিলবে না।

ব্রির বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, অতিরিক্ত ছাঁটা ও চকচকে মিনিকেট চালের প্রতি আগ্রহ পুষ্টির জন্য ক্ষতিকর, কারণ মিলিং ও পলিশিংয়ের সময় চালের উপরিভাগে থাকা জিংক ও আয়রনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত চাষ করলেও ভোক্তার পছন্দ না বদলালে লাভ সীমিতই থাকবে।

নীতির জায়গাতেও বড় পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, কৃষককে শুধু মোট ফলন বা ওজনের ভিত্তিতে নয়, ফসলের পুষ্টিঘনত্বের ভিত্তিতেও মূল্যায়ন ও প্রণোদনা দেওয়া উচিত। রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার, অণুজীব ইনোকুল্যান্ট ও শস্য পর্যায় পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশও করেছেন তারা। পাশাপাশি হাইব্রিড ধান-গমের সঙ্গে জিংক ও আয়রনসমৃদ্ধ স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী শস্য ও মিলেট চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

সব তথ্য একসঙ্গে পড়লে বাংলাদেশের জন্য একটি চক্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশ চালে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বড় সাফল্য দেখিয়েছে, কিন্তু সেই সাফল্যের মাপকাঠি এখনো মূলত টন ও হেক্টরভিত্তিক।

এদিকে জমির জৈব উপাদান কমছে, ফসলে খনিজ কমছে, খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য কম, আর পলিশ করা চালে অবশিষ্ট পুষ্টিও নষ্ট হচ্ছে। এর পরিণতি ভোগ করছে শিশু ও নারীরা। বিষয়টি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি-২), অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্তি ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণ অর্জনের পথেও বড় বাধা হতে পারে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শুধু পেট ভরানো নয়, পুষ্টিকর ও মানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর জন্য প্রয়োজন কৃষক, গবেষক, নীতিনির্ধারক ও ভোক্তা, সবার সমন্বিত উদ্যোগ। পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত, সুস্থ মাটি, বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস এবং কম ছাঁটা চাল, এই চারটিই হতে পারে সমাধানের ভিত্তি।

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *