ঢাকা শহরে মৃদু ভূকম্পন হলেই অনেকের বুক ধড়ফড় করে ওঠে। মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্কের ঢেউ। অথচ পৃথিবী প্রতিদিনই নড়ে—প্রতিদিন গড়ে পঞ্চাশ হাজার ভূমিকম্প হয় এই গ্রহে। বেশিরভাগই এত ক্ষীণ যে আমরা টেরও পাই না। কিন্তু প্রশ্ন থাকে, কেন ঢাকাবাসী এত ভয় পায়?

উত্তরটি একক নয়। এর পেছনে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অতিরিক্ত জনঘনত্বের জটিল মিশ্রণ—যেখানে প্রতিটি ভবন, প্রতিটি গলিঘুঁজির ভেতরেই যেন বিপদের ছায়া লুকিয়ে আছে।


অগোছালো নগর, বিপন্ন মানুষ

রাজধানী ঢাকার জন্ম ও বৃদ্ধি ঘটেছে অনিয়মের বুকে। রাস্তা, ভবন, ড্রেন—সবকিছু যেন গড়ে উঠেছে প্রয়োজনের আগেই ভিড়ে ঠাসা বাস্তবতায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ম্যাপকোয়েস্টের জরিপে বিশ্বের সবচেয়ে অগোছালো শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ষষ্ঠ—একটি শহর যেখানে শৃঙ্খলার চেয়ে বিশৃঙ্খলাই যেন নিয়ম।

ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের তথ্য বলছে, এই শহরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করছে ২৩ হাজারেরও বেশি মানুষ। তুলনায়, তুরস্কের ভয়াবহ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় জনসংখ্যা ছিল মাত্র তিন শতাধিক। এমন পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে—ঢাকা আসলে এক সঙ্কীর্ণ দাহ্য মশাল, যেটি সামান্য স্ফুলিঙ্গেই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে পারে।


পৃথিবীর অন্তরে যে অস্থিরতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া বলেন, “ভয় নয়, প্রস্তুতিই হতে পারে বাঁচার পথ।” তাঁর মতে, ভূপৃষ্ঠের নিচে যে কঠিন শিলাস্তরগুলোর পরস্পর ঠোকাঠুকি, সেই সংঘর্ষ থেকেই জন্ম নেয় ভূমিকম্প।

আমরা আছি ভারতীয় প্লেটে—যেটি উত্তরে ইউরেশিয়ান সাবপ্লেট ও পূর্বে বার্মিজ সাবপ্লেটের সঙ্গে ধীরে ধীরে সংঘর্ষে লিপ্ত। এই সংঘর্ষের ফলেই প্লেটগুলো একে অপরের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে শক্তির সঞ্চয়। কোনো এক সময় সেই সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্তি পেলে পৃথিবী কেঁপে ওঠে—যার নাম ভূমিকম্প।


ঢাকার কম্পনের প্রকৃতি

ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভূকম্পনের গভীরতা সাধারণত ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে। এসবকে বলা হয় অগভীর ভূমিকম্প। এগুলো স্থানীয় ফল্ট বা ফাটল থেকে উদ্ভূত হয়, বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নয়।

ড. ভূঁইয়া ব্যাখ্যা দেন, “অগভীর ভূমিকম্প দ্রুত শক্তি হারায়। কিন্তু গভীর কম্পন তুলনামূলক ধীর—তবু তার কম্পন দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ঢাকার মতো নরম পাললিক মাটিতে সেটিই বেশি বিপর্যয়কর হতে পারে।”


বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা কোথায়

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ভারতীয়, ইউরেশিয়ান ও বার্মিজ প্লেটের সংযোগসীমায় যেকোনো সময় ঘটতে পারে একটি বৃহৎ ভূমিকম্প। এর কেন্দ্রস্থল যদিও ঢাকায় নয়, তবু প্রভাব পড়তে পারে এখানে।
ড. ভূঁইয়া বলেন, “কবে হবে, কেউ জানে না। তবে হবে—এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।”


নরম মাটির শহর, অনিরাপদ স্থাপত্য

ঢাকা এক সময় ছিল জলাভূমির শহর। আজ সেই ডোবা–খাল–জলাশয় মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছে, তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে অগণিত বহুতল ভবন। অধিকাংশ নির্মাণে মানা হয়নি বিল্ডিং কোড।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শহর দাঁড়িয়ে আছে নরম পাললিক শিলার ওপর—যে মাটি শক্তির শত্রু, স্থিতিশীলতার নয়। লন্ডনের মতো শহর শত শত বছর আগে ভিত্তি পিলার দিয়ে শক্ত করেছে, কিন্তু ঢাকায় সেই প্রস্তুতি নেই। ফলে ভূমিকম্প এলে “আমাদের গড়া ঘরই হতে পারে আমাদের কবর”, বলেন অধ্যাপক ভূঁইয়া।


প্রস্তুতিই একমাত্র প্রতিরোধ

ভূমিকম্প থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু তার ধ্বংসযজ্ঞ কমানো যায়—এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের। তাঁদের পরামর্শ—

  • বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন
  • ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সংস্কার
  • শহরে উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ
  • গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন ভূমিকম্পসহনীয়ভাবে তৈরি
  • সাধারণ মানুষকে দুর্যোগ মোকাবিলা প্রশিক্ষণ দেওয়া

ড. ভূঁইয়া বলেন, “আতঙ্কে নয়, প্রস্তুতিতে বাঁচার রাস্তা খুঁজে নিতে হবে। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে শহরকে গড়তে হবে বুদ্ধির শক্তিতে, শুধু ইটের দেয়ালে নয়।”

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *