সমুদ্র থেকে আমরা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তথ্য পাচ্ছি। কিন্তু সেই তথ্য মানুষের কল্যাণে যা ব্যবহার হওয়ার কথা ছিল, তার সামান্যই আমরা ব্যবহার করতে পেয়েছি। পানির নিচে কী ঘটছে, তা বেশিরভাগ সময় আমরা অনুমান করতে পারি না। প্রশ্ন হলো, মানুষ যা পুরোপুরি পারেনি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কি তা করে দেখাতে পারবে?

একজন শৈবাল চাষির কথাই ধরা যাক। পানির নিচে কতটা শৈবাল জন্মেছে, তা না জানলে কবে ফসল তুলবেন, কোথায় আরও টাকা ঢালবেন, তা ঠিক করবেন কীভাবে? আজও এই প্রশ্নের উত্তর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনুমাননির্ভর।

কানাডার প্রতিষ্ঠান কোস্টাল কার্বন ও হোল্ডফাস্ট এই সমস্যারই সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছে। কানাডাস ওশান সুপারক্লাস্টারের সহায়তায় তারা এমন একটি এআই-চালিত সেন্সর বানাচ্ছে, যা দূর থেকেই শৈবালের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।

সমুদ্র নিয়ে আমাদের অসহায়তার সবচেয়ে স্পষ্ট মাপকাঠি সমুদ্রতলের মানচিত্র। নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও জেবকো যৌথভাবে সিবেড ২০৩০ নামে একটি প্রকল্প চালাচ্ছে।

২০২৬ সালের এপ্রিলে তারা জানিয়েছে, বিশ্বের সমুদ্রতলের ২৮.৭ শতাংশের মানচিত্র এখন তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৭১ শতাংশ এখনো অজানা। অগ্রগতিও কম নয়।
২০১৭ সালে প্রকল্প শুরুর সময় মানচিত্র ছিল মাত্র ৬ শতাংশের, আর গত এক বছরেই প্রায় ৫০ লাখ বর্গকিলোমিটার নতুন ডেটা যোগ হয়েছে, যা প্রকল্পের রেকর্ড। তবু ২০৩০ সালের লক্ষ্য ছুঁতে হলে গতি আরও বাড়াতে হবে।

সমস্যা শুধু অজানা অংশ নিয়ে নয়। আমাদের হাতে যে ডেটা আছে, তারও অনেকটাই অব্যবহৃত পড়ে আছে, কারণ কীভাবে বিশ্লেষণ করলে তা থেকে কাজের তথ্য মিলবে, তা আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।

একবার কল্পনা করুন, সমুদ্রের প্রতিটি পরিবর্তন যন্ত্রে ধরা পড়ছে। পরিবেশগত বিপর্যয়, জলজ প্রাণীর চলাচল, অবৈধ মাছ ধরা, জাহাজের বিষাক্ত ধোঁয়া, এমনকি সুনামির আগাম আভাসও।

সমুদ্রসংক্রান্ত বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান তখন অনেক সহজ হয়ে যায়। আমরা এখনো সেই অবস্থা থেকে অনেক দূরে।

ইউরোপীয় সি-বাস মাছের ওপর একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এআই ও কম্পিউটার ভিশন দিয়ে বিভিন্ন খাবারের পরিস্থিতিতে মাছের সাঁতারের ধরন বিশ্লেষণ করেছেন। এতে বোঝা যায় মাছ কখন যথেষ্ট খাবার পেয়েছে, ফলে চাহিদা অনুযায়ী ঠিক যতটুকু খাবার দরকার, ততটুকুই দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

মৎস্য শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসনের (নোয়া) বিজ্ঞানীরা দ্রুত ভিডিও ডেটা বিশ্লেষণ করতে এআই ব্যবহার করছেন।
পোলক মাছ ধরার জালে ভুলে আটকে পড়া স্যামন নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারছে কি না, তা যাচাই করতেই এই বিশ্লেষণ। এতে অনিচ্ছাকৃত মাছ ধরা কমানোর উপায়গুলো মূল্যায়ন ও উন্নত করা যাচ্ছে।

জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে পরিমাপের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট। নোভা স্কোটিয়ার প্রতিষ্ঠান গ্রাফাইট ইনোভেশন অ্যান্ড টেকনোলজিস গ্রাফিন-ভিত্তিক প্রলেপ তৈরি করেছে, যা জাহাজের ঘর্ষণ কমিয়ে দক্ষতা বাড়ায়। কিন্তু প্রলেপ আসলে কতটা কাজ করছে, তা বোঝা সহজ নয়, কারণ এর জন্য জাহাজের পরিচালনার পরিস্থিতি ও তলদেশের রক্ষণাবেক্ষণ দুটোই খতিয়ে দেখতে হয়।

বিনিয়োগ করতে চাওয়া কোম্পানির আসল প্রশ্ন তাই একটাই—আমাদের নিজেদের পরিচালনায় কী বদল এল, আর সেটা কতটা নির্ভুলভাবে মাপা যাচ্ছে?

নির্ভুল আবহাওয়ার পূর্বাভাসও এখানে বড় ভূমিকা রাখে, কারণ জাহাজের পথে সামান্য বদল এনেই বিপুল জ্বালানি বাঁচানো যায়। বন্দরে এআই জাহাজের নোঙর করার প্রক্রিয়া সহজ করতে পারে এবং ইয়ার্ডে কনটেইনারের অকারণ নড়াচড়া কমাতে পারে।
উপকূলীয় ও অফশোর শক্তি খাতে এআই তরঙ্গ ও বায়ুশক্তি কেন্দ্র আরও দক্ষভাবে চালাতে সাহায্য করছে। আর জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রথম শর্ত তো পানির নিচে কী আছে তা সঠিকভাবে জানা, যেখানে এআই-এর ভূমিকা বাড়ছে।

এই উদাহরণগুলো একটি জায়গায় মিলে যায়—এআই সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করছে, ফলাফল মাপতে সাহায্য করছে, আর পরের বিনিয়োগের পক্ষে প্রমাণ জোগাচ্ছে। তবে এই উদাহরণগুলো এখনো আলাদা আলাদা প্রকল্প, বড় পরিসরে সুফল কতটা মিলবে সেটাই আসল প্রশ্ন।

২০২৩ সালে গুগল ও বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) যৌথ একটি প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছিল, এআই-এর বর্তমান প্রয়োগ আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমন ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমানো সম্ভব।

গুগলের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিমাণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বার্ষিক মোট নির্গমনের সমান। কিন্তু এটি একটি আনুমানিক হিসাব মাত্র, যার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে প্রযুক্তি কতটা ব্যাপকভাবে ও কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার হয় তার ওপর।

এর একটি উল্টো দিকও আছে। এআই ও ডেটা সেন্টারের বিস্তারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, ফলে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নিজেদের নির্গমন-লক্ষ্য পূরণই কঠিন হয়ে উঠেছে। তাই হিসাবের খাতায় লিখতে হবে, এআই কতটা কমাতে পারে এবং নিজে কতটা বাড়াচ্ছে, দুটোই।

আসল বাধা তাই প্রযুক্তির নয়, মানুষের। উদ্ভাবকেরা প্রযুক্তি ভালো বোঝেন, আর ব্যবসায়ীরা বোঝেন মাঠের বাস্তবতা। যখন দুই পক্ষ একটি স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে একসঙ্গে কাজ করে, তখনই সত্যিকারের সমাধান বেরিয়ে আসে।

একটি এআই মডেলের দরকার প্রাসঙ্গিক ও সঠিক ডেটা, আর সেই মডেলের ফলাফল কাজের কি না, তা বলতে পারেন কেবল ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ মানুষেরা।

নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদেরও জানতে হয় ঠিক কী বদলাল এবং সেই বদল পরের বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট জোরালো কি না। এ কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠান সবকিছু নিজেরা বানানোর বদলে চটপটে কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাত মেলায়।

কানাডাস ওশান সুপারক্লাস্টারের কাজের ভিত্তিও এই সহযোগিতা। পথটা সহজ—আগে নির্দিষ্ট একটি পরিচালনগত সমস্যা চিহ্নিত করা, তারপর সেটি সমাধানে সঠিক সহযোগী খোঁজা, আর কোন ডেটা ভাগ করতে প্রস্তুত তা আগে থেকেই স্পষ্ট করে রাখা।

ডেটা সংগ্রহের প্রযুক্তি এগোচ্ছে দ্রুত। সেন্সর, ড্রোন ও চালকহীন প্ল্যাটফর্ম এখন সমুদ্রের দুর্গম প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথের স্যাটেলাইট ডেটা পাওয়া সস্তা ও সহজ করেছে, ফলে আর্কটিকের মতো অঞ্চল থেকেও তথ্য আসছে। আগামী দিনে এই ডেটার পরিমাণ হবে বিপুল। কিন্তু তার সঙ্গে আসছে কঠিন কিছু প্রশ্ন। এই ডেটার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? কীভাবে তা ভাগ হবে? বিশেষ করে উত্তরের অঞ্চলগুলোতে ডেটার সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন গভীরভাবে জড়িত।

কোন ডেটা, কার সঙ্গে, কী উদ্দেশ্যে ভাগ করা যাবে, তা নেতাদের স্পষ্ট করে ঠিক করতে হবে। এই সিদ্ধান্তগুলোই সহযোগিতাকে কথার কথা থেকে বাস্তবে নিয়ে আসে।

তাহলে এআই কি পারবে? সৎ উত্তর হলো, হ্যাঁ, তবে শর্ত আছে? এআই এমন কিছু করতে পারছে, যা মানুষ একা পারত না। সে বিশাল ডেটা দ্রুত বিশ্লেষণ করছে, নিদর্শন খুঁজে বের করছে এবং পরিমাপকে সহজ ও নির্ভুল করছে।

সমুদ্রতলের যে ৭১ শতাংশ আজও অজানা, সেখানে যা মিলবে তা সামুদ্রিক প্রজাতি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বাড়াবে, স্বাস্থ্য খাতে নতুন সমাধানের পথ দেখাবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষা মজবুত করবে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা এআই ঠিক করবে না। ঠিক করবে মানুষের তিনটি সিদ্ধান্ত—কোন সমস্যাটি আগে সমাধান করা হবে, ডেটা কে নিয়ন্ত্রণ করবে ও কীভাবে ভাগ হবে এবং ফলাফল মাপার সৎ ব্যবস্থা থাকবে কি না।

নেতৃত্বের প্রথম কাজ তাই সমস্যাটিকে এত স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা, যেন ঠিক কোন প্রশ্নটি করতে হবে তা বোঝা যায়। খুব শিগগিরই আমরা সমুদ্রের আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ডেটা হাতে পাব। এআই সেই বিপুল ডেটার অর্থ বুঝতে সাহায্য করবে এবং এতদিন নাগালের বাইরে থাকা অনেক জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেবে। সেই উত্তর মানুষের কল্যাণে লাগবে কি না, তা নির্ভর করবে আমরা কতটা ভেবেচিন্তে প্রশ্নটি করছি তার ওপর।

তথ্যসূত্র: সিবেড ২০৩০ প্রকল্পের ২০২৬ সালের এপ্রিলের হালনাগাদ; বিসিজি ও গুগলের “Accelerating Climate Action with AI” প্রতিবেদন (২০২৩); মূল প্রতিবেদনে উল্লিখিত নোয়া, কানাডাস ওশান সুপারক্লাস্টার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প।

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *