
সন্ধ্যার পর ঘরে ঘরে টেলিভিশনের সামনে বসে হিন্দি সিরিয়াল দেখা একসময় বেশ নিয়মিত দৃশ্য ছিল। ইদানীং তা অনেকটাই বদলে গেছে।
ট্যাব আর মোবাইলের পর্দায় বুঁদ হয়ে পড়ে গোটা প্রজন্ম। কারও চোখে কোরিয়ান নাটকের নায়িকার কান্না, কারও কানে কে-পপের তালে তালে বাজছে গান।
কোরিয়ান ভাষায় এই ঢেউয়ের নাম হালিয়ু। আর সেই ঢেউ এখন বাংলাদেশে এসে জোরেই আছড়ে পড়ছে।
তরুণদের আড্ডায় থেকে শুরু করে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, স্কিনকেয়ার, পোশাক, এমনকি ঢাকার রেস্টুরেন্টের মেনুতেও এর ছোঁয়া লেগেছে।
প্রশ্ন হলো কীভাবে হঠাৎ এই কোরিয়ান সংস্কৃতি টেউ এদেশে আছড়ে পড়ল?
করোনার সময় অনলাইন ক্লাস চালু হলে অনেক শিক্ষার্থীর হাতে প্রথমবার স্মার্ট ডিভাইস আসে। ট্যাব হাতে পাওয়ার আগে ইন্টারনেট অনেকের কাছে কাছে প্রায় অচেনা ছিল।
আগের প্রজন্ম কিছু না জেনেই দেখে ফেলত। টেলিভিশনের জায়গা নিয়েছে স্ট্রিমিং, আর নানা দেশের কনটেন্টের ভিড়ে কে-ড্রামা নিজের আলাদা আসন গড়ে নিয়েছে।
তবে এই দরজা একদিনে খোলেনি। আগে থেকেই পথ তৈরি করে রেখেছিল কে-পপ আর অ্যানিমে। ২০১২ সালে সাই-এর গ্যাংনাম স্টাইল ইউটিউবে রেকর্ড ভাঙার পর বিশ্ব নড়েচড়ে বসে।
তারপর বিটিএস আর ব্ল্যাকপিংকের মতো দল সংগীতের বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জায়গা পাকা করে নেয়। যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই কে-ড্রামার আগে কে-পপের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন।
এশিয়ার দেশ বলে পারিবারিক বন্ধন, মূল্যবোধ আর সম্পর্কের টানাপোড়েনে বাংলাদেশের দর্শক নিজেদের ছায়া দেখতে পান কোরিয়ানদের মাঝে। মেয়ের সঙ্গে প্রেমিককে দেখে বাবার বিরক্তি, বিয়ের আগে ছেলেটা ভালো কি না তা যাচাই করা, এ দৃশ্য কার ঘরে না ঘটে?
দর্শকেরা বলছেন, হিন্দি সিরিয়ালের মতো এখানে বাড়াবাড়ি নেই, প্রযোজনা পরিচ্ছন্ন, আর থ্রিলার বা মেডিক্যাল ড্রামায় অভিনয় এমন, যেন সত্যিই ডাক্তার বা অপরাধীকে দেখছেন।
এই ঢেউ আরও একটা পুরোনো ধারণায় ধাক্কা দিয়েছে। একসময় ভাবা হতো, পুরুষ মানেই পেশিবহুল শরীর আর দাড়ি-গোঁফের বলিষ্ঠ চেহারা। কে-ড্রামার নায়ক বা কে-পপ আইডলরা সেখানে অন্যরকম। তারা আবেগ লুকান না, ত্বক আর চুলের যত্ন নেন, প্রকাশ্যেই বলেন সানস্ক্রিন আর সিরামের কথা। তাই তরুণ ছেলেদের কাছে স্কিনকেয়ার আর শুধু মেয়েদের ব্যাপার নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোমলতার পাশাপাশি এই তারকারা পুরুষের চিরচেনা অনেক বৈশিষ্ট্যও ধরে রাখেন। কোরিয়ার যুদ্ধ আর উত্তেজনার ইতিহাসে মানুষের মনে যে ভয় আর হতাশা জমেছিল, সেটিকে তাদের সংস্কৃতি খুব ভালোভাবে ছুঁয়ে গেছে।
ঢেউ গড়িয়েছে পর্দার বাইরেও। ভক্তদের মতে, হাই-ওয়েস্ট প্যান্ট, ক্রপ টপ, ঢিলেঢালা জামা আর বড় জ্যাকেটের চল এসেছে কে-ড্রামা থেকেই।
ঢাকার রেস্টুরেন্টে এখন মেলে কিমচি, বিবিম্বাপ আর রামেন, ফুড ফেস্টিভ্যাল আর ফুড ব্লগিং যার চাহিদা বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোরিয়ান খাবারের ঝাল স্বাদ আমাদের কাছে খানিকটা চেনা লাগে। কে-বিউটির মাস্ক আর সিরামও এখন অনেক তরুণীর রোজকার রুটিনের অংশ, অনলাইনে বিক্রিও দেদার। হোমায়রা হক একে বলছেন বাই-প্রোডাক্ট, অর্থাৎ নাটক আর গানের হাত ধরে সঙ্গে সঙ্গে চলে আসা উপহার।
এই সবকিছুর পেছনে দক্ষিণ কোরিয়ার সুচিন্তিত পরিকল্পনাও আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটি স্বাধীনতার পর থেকেই সংস্কৃতিকে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরার মাধ্যম বানিয়েছে, সরকার বদলালেও সেই নীতি বদলায়নি।
ভাষা শিক্ষা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র উৎসব, গানের প্রতিযোগিতা, সবখানেই সরকারি সহায়তা আছে।
অথচ তারা জোর করে বিজ্ঞাপন দেয়নি, ইন্টারনেটের স্রোতেই কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়েছে।
এর ফলে বাংলাদেশের অনেক তরুণ এখন কোরিয়ান ভাষা শিখছেন, কেউ কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য কোরিয়ার দিকেও তাকাচ্ছেন।
তাহলে এই ঢেউয়ের রহস্য কী? কোনো একক কারণ নয়। ইন্টারনেটের প্রসার, কে-পপ ও অ্যানিমের তৈরি করা পথ, মনের কাছাকাছি গল্প, নতুন ধরনের নায়ক আর কোরিয়ার সুপরিকল্পিত সংস্কৃতিচর্চা, সব মিলেই তৈরি হয়েছে এই জোয়ার।




















