চার দশক ধরে এইচআইভি চিকিৎসার একটি নিয়ম অপরিবর্তিত ছিল; ওষুধ বন্ধ করলে সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভাইরাস আবার শরীরে ধরা পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর একদল গবেষক একটি ছোট ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখিয়েছেন, বিশেষ চিকিৎসার মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করলে অন্তত কিছু মানুষ প্রতিদিনের ওষুধ ছাড়াই এই প্রাণঘাতী ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন।

এটি রোগ থেকে নিরাময় নয়, তবে ভবিষ্যতে চিকিৎসার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।

বর্তমানে এইচআইভির প্রধান চিকিৎসা অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি)। এটি নিয়মিত গ্রহণ করলে ভাইরাসের মাত্রা অনেক কমে যায়। এতে রোগী দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে পারেন এবং যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়ান না। তবে এই ওষুধ ভাইরাসকে দমন করে রাখে, শরীর থেকে সম্পূর্ণ দূর করে না।

এইচআইভি দীর্ঘজীবী কিছু রোগ প্রতিরোধ কোষের ভেতরে বছরের পর বছর অবস্থান করতে পারে। তাই চিকিৎসা বন্ধ করলে প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভাইরাস পুনরায় ফিরে আসে।

এ কারণে রোগীদের আজীবন প্রতিদিন ওষুধ খেতে হয়। বিজ্ঞানীরা তাই জানতে চাইছেন, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কি ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রশিক্ষিত করা সম্ভব?

এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন চিকিৎসক স্টিভেন ডিকস। তিনি ১৯৯৩ সালে সান ফ্রান্সিসকো জেনারেল হাসপাতালের ওয়ার্ড ৮৬-এ কাজ শুরু করেন। তখন শহরে এইডসে প্রতিদিন গড়ে তিনজনের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছিলেন, আর প্রচলিত ওষুধ ছিল সীমিত ও বিষাক্ত।

তিনি এক-দুই বছর কাজ করার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু এমন কিছু রোগীর সংস্পর্শে আসেন, যাদের অসুখ অন্যদের তুলনায় ধীরে এগোচ্ছিল। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই তার গবেষণার আগ্রহ তৈরি হয়। আজও তিনি সপ্তাহে অর্ধেক দিন ওই ক্লিনিকে রোগী দেখেন।

প্রাকৃতিকভাবে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের কিছু দৃষ্টান্ত আগে থেকেই জানা ছিল। ইলিট কন্ট্রোলার নামে পরিচিত অল্প কিছু মানুষ চিকিৎসা ছাড়াই এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন।

চিকিৎসক ব্রুস ওয়াকার ১৯৯০-এর দশকে এমন একজনকে পান, যিনি ১৯৭৮ সাল থেকে সংক্রমিত হয়েও কোনো চিকিৎসা ছাড়া অসুস্থ হননি।

পরে গবেষণায় দেখা যায়, কিলার টি-সেল নামের প্রতিরক্ষা কোষ এই নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। আরেকটি উদাহরণ টিমোথি রে ব্রাউন, যিনি বার্লিন পেশেন্ট নামে পরিচিত। লিউকেমিয়ার চিকিৎসায় ২০০৭ সালে তিনি স্টেম-সেল প্রতিস্থাপন করান। দাতার কোষে এমন একটি বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্য ছিল, যা এইচআইভিকে কোষে প্রবেশ করতে দেয় না।

ওষুধ বন্ধ করার পরও তার শরীরে ভাইরাস ফিরে আসেনি। তবে এই চিকিৎসা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তাই অন্য রোগীদের জন্য প্রযোজ্য নয়। এর দ্বারা বোঝা যায়, এইচআইভির স্থায়ী উপস্থিতি অপরিবর্তনীয় নাও হতে পারে।

ডিকসের দল এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ অন্যদের মধ্যে প্ররোচিত করা যায় কি না, তা পরীক্ষা করেছে।

২০২০ সাল থেকে ১০ জন এইচআইভি-আক্রান্ত স্বেচ্ছাসেবী গবেষণায় অংশ নেন, প্রত্যেকে প্রায় ৫০ বার হাসপাতালে আসেন। তাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ শক্তিশালী করার জন্য একাধিক পরীক্ষামূলক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

এর মধ্যে ছিল এইচআইভি-বিরোধী টি-কোষ বাড়ানোর জন্য একটি থেরাপিউটিক ভ্যাকসিন এবং পরীক্ষাগারে তৈরি অ্যান্টিবডি, যা ভাইরাসকে সীমিত করে এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করতে সহায়তা করে।

এরপর কঠোর চিকিৎসা-তত্ত্বাবধানে তাদের প্রতিদিনের ওষুধ বন্ধ করা হয়।

ফলাফল আশাব্যঞ্জক। ১০ জনের মধ্যে ৭ জন ওষুধ ছাড়াই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছেন। এদের মধ্যে ছয়জন কয়েক মাস ভাইরাসের মাত্রা কম রেখেছেন, আর একজনের শরীরে ১৮ মাসের বেশি সময় পরেও ভাইরাস শনাক্তযোগ্য মাত্রায় ফেরেনি।

গবেষণাটি গত ডিসেম্বরে নেচার জার্নালে প্রকাশিত হয়। জুনে প্রকাশিত পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই কিছু অংশগ্রহণকারীর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হতে শুরু করেছিল।

সহ-গবেষক র‍্যাচেল রুটিশাওজারের মতে, কিছু ইমিউন কোষ ভাইরাস ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত অবস্থায় ছিল।

তবে ফলাফল ব্যাখ্যায় সতর্ক থাকা প্রয়োজন। গবেষণাটি ছোট এবং এতে তুলনামূলক কোনো কন্ট্রোল গ্রুপ ছিল না। চিকিৎসাপদ্ধতি এতটাই জটিল যে নিয়মিত ব্যবহারের উপযোগী নয়। চিকিৎসার কোন অংশ নিয়ন্ত্রণ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে, তাও এখনো স্পষ্ট নয়।

ডিকসের মতে, এই প্রথম দেখা গেল যে অন্তত কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এইচআইভির বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে বদলানো সম্ভব। পরবর্তী ধাপ হলো কার্যকর উপাদান শনাক্ত করা এবং আরও সহজ পদ্ধতিতে বেশি মানুষের জন্য তা প্রয়োগযোগ্য করা। এতে কয়েক বছর লাগতে পারে।

অন্যান্য গবেষণাও চলছে। সিএআর টি-সেল থেরাপিতে রোগীর নিজের টি-কোষ জিনগতভাবে পরিবর্তন করে এইচআইভি শনাক্ত করার উপযোগী করা হয়। এই প্রযুক্তি কিছু রক্তের ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে এবং লুপাসের মতো অটোইমিউন রোগেও সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।

বেলজিয়ামের গেন্টে সেপ্টেম্বরে উপস্থাপিত নয়জনের একটি গবেষণায় দুজন দীর্ঘ সময় ওষুধ ছাড়া ভাইরাস দমনে রাখতে পেরেছেন, একজন দুই বছরের বেশি।

টিকা গবেষণায় শেন ক্রটি ও উইলিয়াম শিফের নেতৃত্বে গবেষকেরা বানরের ওপর ধাপে ধাপে টিকা প্রয়োগ করে এমন অ্যান্টিবডি তৈরি করাতে সক্ষম হয়েছেন, যা এইচআইভির বিভিন্ন ধরনকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে। এই কাজে ১৪ বছর সময় লেগেছে।

চিকিৎসা বন্ধ করলে ভাইরাস ফিরে আসে, এই নিয়মের ব্যতিক্রম বহুদিন ধরেই দেখা যাচ্ছিল। এখন গবেষকেরা সেই ব্যতিক্রমকে বহু মানুষের জন্য প্রযোজ্য করার চেষ্টা করছেন।

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *