গভীর রাতের কালো চাদর সরিয়ে এক আশ্চর্য আলোর খেলা শুরু হয়েছে পৃথিবীর আকাশে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর ইউরোপের বিস্তীর্ণ প্রান্ত জুড়ে যেন কোনো নিপুণ শিল্পী সবুজ, গোলাপী আর নীলের তুলি দিয়ে এঁকে চলেছেন এক অপার্থিব আলপনা। এ কোনো মানুষের তৈরি আলোকসজ্জা নয়, এ হলো মহাকাশ থেকে ভেসে আসা এক মহাজাগতিক বার্তা। বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন ‘অরোরা’ বা মেরুজ্যোতি। কিন্তু এই স্বর্গীয় সৌন্দর্যের উৎসের পেছনে লুকিয়ে আছে এক প্রচণ্ড শক্তির হুংকার, যার নাম সৌরঝড়।

আমাদের থেকে কোটি কোটি মাইল দূরে, আমাদের নক্ষত্ররাজ সূর্য মাঝে মাঝে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘করোনাল ম্যাস ইজেকশন’ (CME)। সূর্যের বুক থেকে ছিটকে আসা এই অগ্নিময় নিঃশ্বাস—লক্ষ কোটি চার্জযুক্ত কণার এক নীরব সুনামি—ঘণ্টায় দশ লক্ষ মাইলেরও বেশি বেগে ছুটে আসে পৃথিবীর দিকে। এ যেন এক কামানের গোলা, যা লক্ষ্যভেদ করতে ছুটে আসছে মহাকালের পথ ধরে।

সম্প্রতি সূর্য এমনই এক নয়, পরপর তিনটি শক্তিশালী নিঃশ্বাস ফেলেছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এনওএএ (NOAA) এই ঝড়কে জি-৪ (‘G4’) স্তরের, অর্থাৎ ‘গুরুতর’ বলে চিহ্নিত করেছে। তাদের বিজ্ঞানীরা যা ভেবেছিলেন, ঝড়ের শক্তি ও তেজ তার চেয়েও অনেক বেশি।

যখন এই মহাজাগতিক কণার স্রোত পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, তখন আমাদের গ্রহের এক অদৃশ্য রক্ষাকবচ—তার চৌম্বক ক্ষেত্র—এগিয়ে আসে। এই বর্মের কাছে বাধা পেয়ে সৌরকণারা দুই মেরুর দিকে আকৃষ্ট হয়। সেখানে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বুকে লুকিয়ে থাকা অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন গ্যাসের সঙ্গে যখন তাদের দেখা হয়, তখন সংঘর্ষ হয় না, হয় এক আশ্চর্য মিলন। সেই মিলনের ফলেই জ্বলে ওঠে আলোর এই মহাকাব্য—অরোরা বোরিয়ালিস বা উত্তরের আলো। ইলিনয় থেকে ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস থেকে নিউইয়র্ক—শহরের উজ্জ্বল আলোকে পেছনে ফেলে বহু মানুষ আজ সেই মহাজাগতিক নাটকের সাক্ষী।

তবে এই আলোর কবিতারও এক অন্য পিঠ আছে। যে অদৃশ্য শক্তি আকাশে রঙের ইন্দ্রজাল তৈরি করে, সেই শক্তিই নাড়িয়ে দিতে পারে আমাদের আধুনিক সভ্যতার ভিত। মানুষের শরীরে এর কোনো সরাসরি আঁচড় লাগে না, কিন্তু আমাদের প্রযুক্তির যে সূক্ষ্ম জালের ওপর ভর করে সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে—জিপিএস, রেডিও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ গ্রিড—তা এই ঝড়ের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারে। ইতিহাস সাক্ষী, ১৮৫৯ সালের ‘ক্যারিংটন ইভেন্ট’ টেলিগ্রাফের তারে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। ১৯৭২ সালে এই সৌরঝড়ই ভিয়েতনামে রাখা মার্কিন নৌবাহিনীর মাইনগুলোকে অকারণে বিস্ফোরিত করেছিল।

তাই আজ রাতের আকাশে যে রঙের মেলা, তা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, তা একাধারে তার প্রচণ্ড শক্তিরও নিদর্শন। এ যেন একাধারে এক মোহনীয় শিল্পকর্ম এবং ভবিষ্যতের জন্য এক নীরব সতর্কবার্তা। সূর্য তার নিঃশ্বাসের মাধ্যমে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, এই মহাবিশ্বের বিশালতার কাছে আমরা কতটা ক্ষুদ্র, আর তার সৌন্দর্য কতটা ভয়ংকর সুন্দর হতে পারে।

লেখা : আল-জাজিরা অবলম্বনে

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *