
এক নিস্তব্ধ রাতে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা বিজ্ঞাপনগুলো যদি আপনারই মনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে, তবে অবাক হবেন কি? বিজ্ঞাপনের রঙে যদি খুঁজে পান আপনার প্রিয় রঙের ছোঁয়া, তার সুরে যদি বাজে আপনার প্রিয়তম সংগীত, আর তার ভাষা যদি হয় আপনারই চিন্তার প্রতিধ্বনি—তবে বুঝে নেবেন, আপনি বিজ্ঞাপনের সেই নতুন যুগে প্রবেশ করেছেন, যার চালিকাশক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
এটি এখন আর কোনো দূরবর্তী কল্পনা নয়, বরং এক চলমান বাস্তবতা। প্রযুক্তি এবং মনস্তত্ত্বের এই যুগলবন্দী বিজ্ঞাপনের সংজ্ঞাকেই বদলে দিচ্ছে।
প্রযুক্তি যেভাবে আপনার মনের অন্দরে প্রবেশ করে
বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো, যেমন ‘চেইল ইউকে’, এখন এমন শক্তিশালী এআই মডেল ব্যবহার করছে যা এক ডিজিটাল গোয়েন্দার মতো কাজ করে। এটি আপনার অনলাইন জগতের প্রতিটি পদচিহ্ন—ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা রেডিটে আপনার পোস্ট, আপনার গুগল সার্চের ইতিহাস, এমনকি চ্যাটজিপিটির সঙ্গে আপনার কথোপকথন—গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে।
এর উদ্দেশ্য কেবল আপনার বয়স, লিঙ্গ বা অবস্থান জানা নয়। বরং এর লক্ষ্য আপনার ব্যক্তিত্বের একটি মনস্তাত্ত্বিক মানচিত্র তৈরি করা। এআই বোঝার চেষ্টা করে, আপনি কি অন্তর্মুখী না বহির্মুখী? আপনি কি কোলাহল ভালোবাসেন, নাকি শান্ত পরিবেশ আপনার পছন্দ? এই সমস্ত তথ্য ব্যবহার করে বিজ্ঞাপনকে এমনভাবে সাজানো হয়, যা প্রতিটি ব্যক্তির জন্য হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র ও ব্যক্তিগত। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য—লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য লক্ষ লক্ষ ভিন্ন ভিন্ন বিজ্ঞাপন তৈরি করা, যা প্রত্যেকের কাছেই একান্ত ব্যক্তিগত বার্তা বলে মনে হবে।
চেইল ইউকে-এর প্রধান নির্বাহী ক্রিস কামাচোর ভাষায়, ‘আমরা এখন সাধারণ তথ্যভিত্তিক জগৎ থেকে বেরিয়ে মানুষের আবেগ ও মনস্তত্ত্বের এক গভীরতর স্তরে প্রবেশ করছি। এআই আপনার ডিজিটাল জগতের প্রতিটি কোণে বিচরণ করে আপনার মানসিক অবস্থা—আপনি সুখী, দুঃখী, নাকি কোনো সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন—তার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করতে পারে।’
একদিকে সম্ভাবনা, অন্যদিকে গভীর আশঙ্কা
এই প্রযুক্তির সমর্থকরা এর মধ্যে এক বিরাট সম্ভাবনা দেখছেন। তাদের মতে, এর মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের জগতে যে বিপুল অপচয় হয়—অর্থাৎ যে বার্তাগুলো দর্শকের চোখেই পড়ে না—তার অবসান ঘটবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী বিশেষভাবে তৈরি বিজ্ঞাপনগুলো সাধারণ বিজ্ঞাপনের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং গ্রাহকরাও তাতে আপত্তি করেননি। নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জ্যাকব টিনি মনে করেন, যদিও প্রযুক্তিটি এখনও বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে, তবে এটিই ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ভবিষ্যৎ।
কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠে রয়েছে এক হিমশীতল বাস্তবতা। অনেকেই এই অতি-ব্যক্তিকরণকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর এক মারাত্মক আঘাত বলে মনে করছেন। ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ক্যাল্ডার এই ধরনের বিজ্ঞাপনকে ‘অস্বস্তিকর আবর্জনা’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ‘কেবল একজন মানুষকে দেখানোর জন্য তৈরি বিজ্ঞাপন অর্থহীন, কারণ তা মানুষের মনে কোনো স্থায়ী ছাপ ফেলতে পারে না।’
ব্র্যান্ড কনসালট্যান্ট ইভান মাতো আরও গভীরে গিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—এই সর্বব্যাপী নজরদারির যুগে মানুষ কি আদৌ এমন বিজ্ঞাপন চায়? তার মতে, ‘প্রকৃত প্রশ্নটি হলো, ব্র্যান্ডগুলোর কি সবকিছু ব্যক্তিগত করার অধিকার আছে? আর যদি তারা তা করে, তবে এর বিনিময়ে তারা কী হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে?’
বিজ্ঞাপনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিপদ
এই প্রযুক্তির বিপদ শুধু পণ্য বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্রিস কামাচো নিজেও এর অন্ধকার দিকটি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘একদল এই প্রযুক্তিকে নৈতিকভাবে ব্যবহার করবে, কিন্তু আরেক দল এটিকে ব্যবহার করবে মানুষকে প্রভাবিত করতে, তাদের সিদ্ধান্তকে ভুল পথে চালিত করতে।’
যখন এই প্রযুক্তি রাজনৈতিক প্রচার বা নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে, তখন এর প্রভাব হতে পারে ভয়ঙ্কর। মানুষের মনকে নির্দিষ্ট দিকে চালিত করে ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা এক অশুভ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত বিজ্ঞাপন আসলে দুই দিকে ধার থাকা এক তলোয়ারের মতো। একদিকে এটি ব্র্যান্ড এবং গ্রাহকের মধ্যে আরও গভীর ও অর্থপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির সম্ভাবনা রাখে। অন্যদিকে, এটি আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কেড়ে নিয়ে এক নিয়ন্ত্রণমূলক সমাজের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কামাচো নৈতিকতার পথে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেও, প্রশ্ন থেকে যায়—এই প্রযুক্তির লাগাম কার হাতে থাকবে? এটি কি মানুষের জীবনকে আরও সহজ করবে, নাকি আমাদের অজান্তেই আমাদের নিয়ন্ত্রণের অদৃশ্য সুতো হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের ডিজিটাল ভবিষ্যতের রূপরেখা।
লেখা : বিবিসি অবলম্বনে










































