
সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে মোবাইলটা হাতে নেওয়া অভ্যাস বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ইফতির। প্রতিদিনের মতো মোবাইল হাতে নিয়েই ফেসবুকে একটু ঢুঁ মারতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কিছুতেই ফেসবুকে প্রবেশ করতে পারছেন না। বারবার পাসওয়ার্ড লিখলেও তা ভুল দেখাচ্ছে। এই সময় এক বন্ধু ফোন করে তড়িঘড়ি কণ্ঠে জানাল, ইফতি তুই ফেসবুকে এসব কি পোস্ট করেছিস আজেবাজে জিনিস! ইফতি কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। ইফতির বন্ধুটি আরও জানায়, ফেসবুকে নাকি বিব্রতকর নানা তথ্য ও আপত্তিকর ছবি পোস্ট করেছে ইফতি। হচকচিত ইফতি নিজের গায়ে নিজেই জোরে একটা চিমটি কাটল। উহ! না ঘুমের ঘোরে তো নেই তাহলে এসব কী হচ্ছে?
তখনই ইফতি বুঝতে পারে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হয়তো হ্যাক হয়েছে। অন্য কেউ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে। এরকম প্রতিনিয়তই বহু মানুষ তাদের ফেসবুক নিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।
ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে তা আপনাকে বিভিন্নভাবে সমস্যায় ফেলতে পারে। এমনও হতে পারে যে কেউ আপনার ছদ্মবেশে অন্য কাউকে বার্তা পাঠাচ্ছে কিংবা কোনো কিছু পোস্ট করছে যা অদ্ভুত ও অরুচিকর, বা আপনার ভাবমূর্তির সঙ্গে যায় না।
এ ধরনের সমস্যা যেকোনো সময় যেকোনো ফেসবুক ব্যবহারকারীর হতে পারে। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হলে কী করতে হবে, তা জেনে নেওয়া যাক।
প্রথমেই পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন
পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করাটা হবে প্রথম উদ্যোগ, যদি আপনি তা করতে পারেন। আর যদি লগ ইন অবস্থায় না থাকেন, তাহলে পাসওয়ার্ড রিসেট (password reset) করুন। আপনার ইমেইল অ্যাকাউন্টে আসা নির্দেশনা অনুসরণ করে পাসওয়ার্ড বদলে ফেলুন দ্রুত।
এর জন্য setting & privacy অপশনে ক্লিক করুন। এরপর setting লেখা অপশন আসবে সেখানে ক্লিক করুন। এরপর বামপাশে উপরের কর্নারে Meta account centre নামে একটা ঘর আসবে সেখানে password & security অপশনে ক্লিক করুন। এরপর change password অপশনে ক্লিক করুন।
পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের সময় Log out of other devices নামে একটি অপশন আসবে। এখান থেকে সন্দেহজনক লগ ইনগুলোকে লগ আউট করে দিন। জটিল পাসওয়ার্ড (বড় হাতের অক্ষর, বিশেষ চিহ্ন, নম্বর) ব্যবহার করুন। অন্য কোনো অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করেছেন, এমন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। পাসওয়ার্ড মনে রাখতে সমস্যা হলে ভালো কোনো পাসওয়ার্ড ম্যানেজার অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।

বিভিন্ন কৌশলে ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই দ্রুত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে ফেলে হ্যাকাররা। ফলে ব্যবহারকারীরা চাইলেই নিজেদের অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারে না। এমনকি নতুন করে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা যায় না। ফলে অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হলে প্রথমেই পাসওয়ার্ড রিসেট করতে হবে। এ জন্য ফেসবুক ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে ‘Forgotten password?’ অপশনে ক্লিক করে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় দেওয়া মুঠোফোন নম্বর বা ই–মেইল ঠিকানা লিখতে হবে। এবার ‘Reset Your Password’ অপশনে ক্লিক করলেই পাসওয়ার্ড রিসেট হবে। ফলে নতুন পাসওয়ার্ড দিয়ে আবার ফেসবুকে প্রবেশ করা যাবে।
ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট
ফেসবুক আইডি হ্যাক করে হ্যাকাররা যদি অ্যাকাউন্ট খোলার সময় দেওয়া মুঠোফোন নম্বর এবং ই–মেইল ঠিকানা পরিবর্তন করে ফেলে, তবে চাইলেও পাসওয়ার্ড রিসেট করে ফেসবুকে প্রবেশ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই আইডি হ্যাক হওয়ার বিষয়ে ফেসবুকের কাছে অভিযোগ করতে হবে। এ জন্য www.facebook.com/hacked ঠিকানায় প্রবেশ করে my account is compromised অপশনে ক্লিক করতে হবে। এরপর অ্যাকাউন্টটিতে থাকা মুঠোফোন নম্বর, ই–মেইল বা ব্যবহারকারীর নাম লিখে সতর্কতার সঙ্গে অ্যাকাউন্টটি শনাক্ত করতে হবে। এবার ‘security check’ অপশনে ক্যাপচা (বিশেষ কোড) লিখলেই অ্যাকাউন্টটির পুরোনো পাসওয়ার্ডসহ নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্ন জানতে চাইবে ফেসবুক। প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর দিয়ে সাবমিট অপশনে ক্লিক করলেই ফেসবুকের কাছে অভিযোগ জমা হবে।
যদি অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে না পারেন, তার কারণ হতে পারে হ্যাকার আপনার লগইন সেশন মুছে দিয়েছে বা লগইন ডিটেইলস বদলে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে (https://www.facebook.com/hacked) লিঙ্কের মাধ্যমে আক্রমণের শিকার অ্যাকাউন্টের তথ্য দ্রুত রিপোর্ট করতে হবে। রিপোর্ট করলে ফেসবুক পরে আক্রান্ত অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সংযুক্ত ই-মেইল অ্যাড্রেস বা ফোন নম্বর ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট রিকভার করতে সহায়তা করবে।
যদি সেটিংসের ‘চুজ ফ্রেন্ডস টু কনট্যাক্ট ইফ ইউ গেট লকড আউট’ অপশনটি চালু করে রাখেন, তাহলে পরবর্তী ফাংশনটি ব্যবহার করে প্রয়োজনে অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার করা যাবে। উল্লিখিত ফাংশনের মাধ্যমে ৩ থেকে ৫ জন বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে বাছাই করা যাবে। যারা অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সহায়তা হবে।

ফাংশনটি চালু করতে লগইন পেজের ‘ফরগটেন অ্যাকাউন্ট?’ অপশন নির্বাচন করতে হবে। তার পর ই-মেইল বা ফোন নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্টটি সার্চ করতে হবে। অ্যাকাউন্ট খুঁজে পাওয়ার পর আগে নির্বাচিত বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের নাম প্রবেশের অপশন আসবে। তাদের কাছে অ্যালার্ট ও লিঙ্ক পৌঁছে যাবে। শুধু তারাই অ্যালার্ট ও লিঙ্কে প্রবেশ করতে পারবেন। নির্বাচিত ব্যক্তিরা ওই লিঙ্কে প্রবেশে রিকভারি কোড পাবেন, যা তারা আক্রান্ত অ্যাকাউন্টধারীকে জানাবেন। ফলে আক্রান্ত আবার নিজ অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার পাবেন।
লক পরিবর্তন
অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের পর সিকিউরিটি অ্যান্ড লগইন সেটিংসে গিয়ে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা বা ইউজ টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন বা টুএফএ চালু করা জরুরি। আক্রান্ত অ্যাকাউন্টের ডেটায় অ্যাকসেস বিদ্যমান এমন যে কোনো সন্দেহজনক বা ক্ষতিকর অ্যাপ্লিকেশন মুছে দেওয়ার পরামর্শ দেয় ফেসবুক। তাই সেটিংসের অ্যাপস অ্যান্ড ওয়েবসাইট অপশন থেকে বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে না এমন বা পরিচিত নয়, এমন অ্যাপস খুঁজে বের করে তা দ্রুত রিমুভ করতে হবে। অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে তা দ্রুত বন্ধুদের জানিয়ে দিয়ে তাদের সাবধান করতে উৎসাহিত করে ফেসবুক। ফলে বন্ধুদের ওই অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার আগ পর্যন্ত আক্রান্ত অ্যাকাউন্ট থেকে পাঠানো যে কোনো লিঙ্ক বা পোস্টে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকতে বলতে হবে।
নিরাপত্তা নিশ্চিতে ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সেটিংসের ‘লগইনস অ্যান্ড সিকিউরিটি’ অপশনের গেট অ্যালার্টস অ্যাবাউট আনরিকগনাইজড লগইনস অপশনে সাইনআপ করতে হবে। অপশনটি নির্বাচিত থাকলে অপরিচিত যে কোনো ডিভাইস থেকে অ্যাকাউন্টে লগইন করা হলে ফেসবুক সাবধান করবে। অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধাপ অনুসরণে সহায়তা করবে। ডিজিটাল মিডিয়ায় ফেসবুক ছাড়াও নতুন অ্যাপ ও প্ল্যাটফর্মে ক্ষতিসাধনে হ্যাকাররা প্রতিনিয়ত নিজেদের কৌশল বদলায়। তাই সব সময় সতর্ক থাকা, সিকিউরিটি নিশ্চিত করে অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা জোরদার করা ও হ্যাক হলে কী করতে হবে, তা জেনে রাখা জরুরি।
হ্যাকিং ঠেকাবেন যেভাবে
ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে হ্যাকারদের পাতা ফাঁদে পা দেওয়া। আপনি হয়তো মেসেঞ্জারে একটি লিংক পেলেন, যাতে লেখা, ‘ওএমজি, জানো কে মারা গেছে?’ আপনি লিংকে ক্লিক করলেন, দেখলেন প্রায় ফেসবুকের মতো দেখতে একটি ইন্টারফেস, কিন্তু আপনাকে আবারও লগইন করতে বলা হচ্ছে। আপনি কিছু না ভেবেই ফেসবুক অ্যাকাউন্টের ইমেইল ও পাসওয়ার্ড দিয়ে দিলেন। ব্যাস! আপনার পাসওয়ার্ড অন্য কেউ জেনে গেলো। কারণ ফেসবুক মনে করে যে ওয়েবসাইটে আপনি আপনার আইডি পাসওয়ার্ড দিলেন, সেটি আসলে ফেসবুক নয়।
যখনই ব্রাউজারের মাধ্যমে ফেসবুকে লগ ইন করবেন, খুব ভালোভাবে ইউআরএল (ওয়েব অ্যাড্রেস) দেখে নিতে হবে। দেখতে হবে ওয়েবসাইটের ঠিকানা https://www.facebook.com দিয়ে শুরু হয়েছে কিনা। ‘facebook’ বানান খুব ভালোভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। অনেক সময় হ্যাকাররা ‘facebok’, ‘ffacebook’ বা ‘facbook’ ইত্যাদি বিভ্রান্তিকর ইউআরএল ব্যবহার করতে পারে। এসব বিভ্রান্তি এড়াতে ব্রাউজারের এড্রেস বারে নিজেই facebook.com লিখে সার্চ দিন। মোবাইল অ্যাপের ক্ষেত্রে এ সমস্যা নেই।
অনেক সময় হ্যাকাররা ফেসবুক আইডি হ্যাক করে বন্ধু তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের অশ্লীল মন্তব্য, ছবি বা ভিডিও পাঠিয়ে থাকে। কেউ আবার বিপদে পড়ার কথা বলে অর্থও চায়। শুধু তা–ই নয়, সমাজ বা রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন পোস্টও দিয়ে থাকে। আর তাই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলেই ফোনকল বা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ সাইটের মাধ্যমে ফেসবুকে থাকা বন্ধুদের বিষয়টি জানাতে হবে। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়টি জানানো উচিত।
হ্যাকারদের হাত থেকে অ্যাকাউন্ট ফেরত পাওয়ার পর তা নিরাপদ রাখতে সিকিউরিটি সেটিংস রিভিউ করা জরুরি। হ্যাকিং (ফেসবুক) হলে কীভাবে ফের অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যায়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা চাই সবার।










































