মাঝরাত। হোস্টেলের ঘরে এক শিক্ষার্থী ল্যাপটপে লিখল, ‘আমার মন খারাপ, কী করব?’ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পর্দায় ফুটে উঠল গোছানো একটি উত্তর। মনে হলো, ওপাশে কেউ একজন বসে আছে, শুনছে, ভাবছে।

শিক্ষার্থীটি জানে না, ওপাশে কোনো মুখ নেই। আছে সংখ্যা। অগণিত সংখ্যা। প্রশ্নটা তাই সোজা—এই পুরো ব্যাপারটা কি শুধুই গণিত?

প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে চলুন একটি রান্নাঘরে ঢুকি। গণিত হলো রান্নার রেসিপির মাপজোখের মতো—কতটুকু নুন, কতক্ষণ আঁচ।

ডেটা হলো বাজার থেকে আনা সব উপকরণ। কম্পিউটার আর বিদ্যুৎ হলো চুলা ও তার আঁচ। মানুষ হলো সেই স্বাদ-পরখকারী, যে বলে ‘হ্যাঁ, এটা ঠিক হয়েছে’ বা ‘না, আরেকটু ঝাল চাই।’ আর রাঁধুনি? সেই প্রকৌশলীর দল, যারা সবকিছু একসঙ্গে সামলায়।

রেসিপির মাপজোখ ছাড়া রান্না হয় না, সেটা সত্যি। কিন্তু শুধু মাপজোখ দিয়ে কি রান্না হয়?

গণিতের দিকটা অস্বীকার করার উপায় নেই। একটি কৃত্রিম নিউরন যা করে, তা এক লাইনে লেখা যায়: y = f(Wx + b). ইনপুট x-কে ওজন W দিয়ে গুণ করো, পক্ষপাত b যোগ করো, তারপর একটি ফাংশন f চালাও। ব্যস। এই সরল কাজটাই কোটি কোটি বার, শত শত স্তরে, বিলিয়ন প্যারামিটার নিয়ে চলে।

শেখাও গণিত। মডেল ভুল করলে সেই ভুলের পরিমাণ মাপা হয়। ক্যালকুলাস বলে দেয় কোন সংখ্যা কোন দিকে সামান্য সরালে ভুল কমবে। গ্রেডিয়েন্ট ডিসেন্ট সেই সংখ্যাগুলোকে অল্প অল্প করে সরায়। ভুল, হিসাব, সংশোধন; আবার ভুল, আবার হিসাব; এভাবে লক্ষ-কোটিবার।

ভাষা মডেলের কাজও মূলত সম্ভাব্যতার খেলা। ‘বাংলাদেশের রাজধানী হলো…’ লিখলে সে পরের শব্দ হিসেবে ‘ঢাকা’-কে সবচেয়ে উঁচু সম্ভাবনা দেয়, সেটি জুড়ে আবার পরেরটি অনুমান করে। একটি একটি করে শব্দ গেঁথে তৈরি হয় আস্ত অনুচ্ছেদ।
শিক্ষাঙ্গনও এ কথায় সায় দেয়। এসিএম ও আইইইই-র যৌথ পাঠ্যক্রমে এআই ও মেশিন লার্নিংয়ের জন্য গণিত ও পরিসংখ্যানের শর্ত বাড়ানো হয়েছে।

তাহলে কি রায় হয়ে গেল, শুধুই গণিত? এখনই নয়। আগে বাজারে যাই। একই রেসিপি, কিন্তু উপকরণ বাসি হলে কী হয়? ফল ভালো হয় না। এআইয়ের ক্ষেত্রেও তাই।

ডিপমাইন্ডের গবেষণা একটি মজার ব্যাপার দেখিয়েছে। ৭০ বিলিয়ন প্যারামিটারের ‘চিনচিলা’ মডেল ২৮০ বিলিয়ন প্যারামিটারের ‘গোফার’-কে ছাড়িয়ে গেছে, শুধু বেশি ডেটায় প্রশিক্ষিত হয়েছিল বলে। মোটামুটি প্রতি প্যারামিটারে প্রায় ২০টি টোকেন ছিল তাদের হিসাবে সেরা অনুপাত। অর্থাৎ ছোট রাঁধুনি, ভালো বাজার, সেরা খাবার।

কিন্তু বাজারেও টান পড়ছে। গবেষণা সংস্থা ইপোক এআই-এর অনুমান, মানুষের লেখা মানসম্মত পাবলিক টেক্সটের মজুত প্রায় ৩০০ ট্রিলিয়ন টোকেন, আর বর্তমান গতিতে ২০২৬ থেকে ২০৩২-এর মধ্যে তা ফুরিয়ে আসতে পারে।

এটি পূর্বাভাস, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়; আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা প্রতিবেদন ভিন্ন সংজ্ঞায় আরও ছোট হিসাব দিয়েছে।
সমাধান হিসেবে এআই-তৈরি ডেটা আনা যায়, কিন্তু সেখানেও ভয়—ভুলের ওপর ভুল জমে একসময় মডেল নিজেই নিজের নকলে বিগড়ে যেতে পারে।

গণিত একই থাকে, কিন্তু উপকরণ বদলালে রান্না বদলে যায়। সুতরাং গণিত একা নয়।

এবার সবচেয়ে মজার কথা বলি। ওপেনএআইয়ের ২০২২ সালের ইনস্ট্রাক্টজিপিটির গবেষণায় মানুষের পছন্দ-অপছন্দ দেখিয়ে মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। ফল? ১.৩ বিলিয়ন প্যারামিটারের ছোট মডেলের উত্তর মূল্যায়নকারীদের কাছে ১৭৫ বিলিয়ন প্যারামিটারের বিশাল জিপিটি–৩ এর চেয়েও বেশি পছন্দ হলো।

কোনো সমীকরণ বলে দেয়নি ‘ভদ্র উত্তর ভালো’ বা ‘বিপজ্জনক পরামর্শ খারাপ’। সেটা বলেছে মানুষ। আর কোন মানুষ? একদল নির্দিষ্ট মূল্যায়নকারী, সমগ্র মানবজাতি নয়। কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য, এই প্রশ্নের উত্তর গণিতের পাতায় লেখা নেই; সেটা সমাজ, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার প্রশ্ন।

রেসিপি কাগজে লেখা যায়, কিন্তু রান্না হয় আগুনে। আধুনিক এআইয়ের আগুন হলো জিপিইউ-ভরা ডেটা সেন্টার।

স্ট্যানফোর্ডের এআই ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ৫ হাজার ৪২৭টি ডেটা সেন্টার আছে, যা অন্য যেকোনো দেশের ১০ গুণেরও বেশি।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ-চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। তবে একই সংস্থার হিসাবে বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ-চাহিদা বৃদ্ধির মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ আসবে ডেটা সেন্টার থেকে। বিষয়টি তাই ভয় দেখানোর নয়, আবার উড়িয়ে দেওয়ারও নয়।

গণিত নিজে বিদ্যুৎ খায় না; তাকে চালাতে হয়। সেই চালানোই এক বিরাট বাস্তব, ভৌত ব্যাপার।

এবার একটি অস্বস্তিকর তথ্য দিই। ২০১৭ সালে গুগলের গবেষক আলি রাহিমি এক সম্মেলনে বলেছিলেন, মেশিন লার্নিং অনেকটা ‘অ্যালকেমি’র মতো হয়ে গেছে: অনেক কিছু কাজ করে, কিন্তু কেন করে, তা পুরোপুরি বোঝা যায় না।

ইয়ান লেকুন পাল্টা বলেছিলেন, ইতিহাসে প্রকৌশল প্রায়ই তত্ত্বের আগে এসেছে, ব্যাখ্যা এসেছে পরে।

দুই পক্ষই কিছুটা ঠিক। স্কেলিং ল-র উদাহরণ নিন। ওপেনএআইয়ের গবেষকেরা ২০২০ সালে দেখিয়েছিলেন, মডেলের আকার, ডেটা ও কম্পিউট বাড়ালে ভুল নিয়মমাফিক কমে। সমীকরণটি সুন্দর, কিন্তু তার সহগ এসেছে পরীক্ষার ফল থেকে, কোনো প্রমাণ থেকে নয়। আর এই নিয়ম বলে ভুল কমবে; এও বলে না যে প্রতিটি কাজে মডেল দক্ষ হবে বা নিরাপদ থাকবে।

বুঝতে পারছেন তো? আমরা এমন রান্না করছি, যার স্বাদ দারুণ, অথচ কোন মশলার কী ভূমিকা, তা পুরোপুরি জানি না।

স্ট্যানফোর্ড এআই ইনডেক্স ২০২৬ এই অদ্ভুত বৈপরীত্যের নাম দিয়েছে ‘জ্যাগড ফ্রন্টিয়ার’, মানে এবড়োখেবড়ো সীমান্ত। গুগলের জেমিনি ডিপ থিংক ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক-মানের ফল করেছে। অথচ ক্লোকবেঞ্চ পরীক্ষায় সেরা মডেল অ্যানালগ ঘড়ি ঠিকভাবে পড়তে পেরেছে মাত্র ৫০.১% ক্ষেত্রে, মানুষ পেরেছে ৯০.১%।

যে যন্ত্র অলিম্পিয়াডের সমস্যা সমাধান করে, সে দেয়ালঘড়ির কাঁটা গুলিয়ে ফেলে। মানুষের কাছে যা সহজ, তা যন্ত্রের কাছেও সহজ, এমন কোনো নিয়ম নেই। এই এবড়োখেবড়ো চেহারাই মনে করিয়ে দেয়, সংখ্যার ভেতরের বুদ্ধি আর মানুষের বুদ্ধি এক জিনিস নয়।

এবার ফিরে আসি সেই শিক্ষার্থীর কাছে, যার কথা শুরুতে বলেছিলাম। শিক্ষার্থীটি যে উত্তরটি পেয়েছিল, তা কি তাহলে ‘শুধুই গণিত’? এক অর্থে, হ্যাঁ। সেই উত্তর বেরিয়ে এসেছে ম্যাট্রিক্স গুণ, সম্ভাব্যতা আর গ্রেডিয়েন্টের ভেতর দিয়ে।

আরেক অর্থে, না। সেই উত্তরের পেছনে ছিল অগণিত মানুষের লেখা বাক্য, মূল্যায়নকারীদের পছন্দ-অপছন্দ, প্রকৌশলীদের হাজারো সিদ্ধান্ত আর একটি ডেটা সেন্টারের অবিরাম আঁচ। আর সবকিছুর ওপরে ছিল এমন একটি প্রশ্ন, যার উত্তর আমরা এখনো পুরোপুরি জানি না।

বলা যায়, গণিত এআইয়ের ভাষা। কিন্তু ভাষা দিয়ে যেমন শুধু ব্যাকরণ বোঝায় না, গল্পও বলা যায়, তেমনি এই ভাষায় যা বলা হচ্ছে, তার বিষয়বস্তু, মূল্যবোধ আর পরিণতি ঠিক করি আমরা, মানুষেরা।

তাই ‘এআই কি শুধুই গণিত?’ প্রশ্নের সবচেয়ে সৎ উত্তর হয়তো এমন—‘গণিত ছাড়া এআই হয় না, কিন্তু গণিতই এআই নয়।’

Muktojanala

চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এক উন্মুক্ত বাংলা প্ল্যাটফর্ম। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও জীবনের বিচিত্র রঙ্গের বিশ্লেষণ। প্রতিদিনের ভাবনায় নতুন আলো ছড়াতে আমরা আছি আপনার পাশে।

https://www.muktojanala.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *